কবিতার খাতা থেকে – নবম

এডওয়ার্ড লিয়ার (Edward Lear, ১৮১২–১৮৮৮)

— ভিক্টোরিয়ান যুগের nonsense poet যিনি Limerick ফর্মকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। তাঁর কবিতা হাস্যকর, অযৌক্তিক, কল্পনাপ্রসূত এবং ছন্দময় — যা শিশু ও বড়োদের সবাইকে সমানভাবে আনন্দ দেয়।

১. দাড়িওয়ালা বুড়ো মানুষ (There was an Old Man with a beard)

দাড়িওয়ালা এক বুড়ো মানুষ ছিল,
সে বলল, “যা ভয় পেয়েছি তাই হল!”
দুটো পেঁচা আর একটা মুরগি,
চারটা টিয়া আর একটা চড়ুই —
সবাই তার দাড়িতে বাসা বেঁধেছে!

২. গাছের বুড়ো মানুষ (There was an Old Man in a tree)

একটা গাছে বসে ছিল এক বুড়ো মানুষ,
তাকে একটা মৌমাছি খুব জোরে কামড়াল।
যখন বলা হল, “কি গুনগুন করছে?”
সে বলল, “হ্যাঁ, খুব জোরে গুনগুন করছে!
এটা তো একটা সত্যিকারের দুষ্টু মৌমাছি!”

৩. নরওয়ের তরুণী (There was a Young Lady of Norway)

নরওয়ের এক তরুণী ছিল,
সে দরজার সামনে বসে ছিল নির্বিকার।
দরজা যখন তাকে চেপে ধরল,
সে বলল, “তাতে কী হয়েছে?”
এই সাহসী নরওয়ের তরুণী!

৪. ডোভারের বুড়ো ব্যক্তি (There was an Old Person of Dover)

ডোভারের এক বুড়ো ব্যক্তি ছিল,
সে নীল ক্লোভারের মাঠ দিয়ে দৌড়ে গেল।
কিন্তু কিছু বড়ো মৌমাছি
তার নাক আর হাঁটুতে কামড়াল,
তাই সে তাড়াতাড়ি ডোভারে ফিরে গেল।

৫. পেঁচা ও বিড়ালছানা (The Owl and the Pussycat)

পেঁচা আর বিড়ালছানা সমুদ্রে গেল
একটা সুন্দর মটর-সবুজ নৌকায়।
তারা সঙ্গে নিল কিছু মধু,
আর অনেক টাকা —
পাঁচ পাউন্ডের নোটে মুড়ে রাখা।

(তারা বিয়ে করল একটা শূকরের মাথায়,
আর নাচল — রাতভর!)

৬. জাম্বলিরা (The Jumblies)

জাম্বলিরা সমুদ্রে গেল
একটা চালুনিতে!
বন্ধুরা যতই বারণ করুক,
শীতের সকালে, ঝড়ের দিনে,
তারা চালুনিতে সমুদ্রে গেল!

৭. পোবল যার পায়ের আঙুল নেই (The Pobble Who Has No Toes)

পোবল যার পায়ের আঙুল নেই,
একদিন তারও অনেক আঙুল ছিল।
যখন বলা হল, “একদিন সব হারিয়ে ফেলতে পারো”,
সে বলল, “ফিশ ফিডল ডি-ডি!”

৮. গরুর ভয়ে বুড়ো মানুষ (There was an Old Man who said, “How…”)

এক বুড়ো মানুষ বলল, “কী করব?
এই ভয়ংকর গরু থেকে কীভাবে পালাব?”
“আমি এই বেড়ার ওপর বসব,
আর হাসতে থাকব,
যাতে গরুটার মন গলে যায়!”

৯. কোয়াঙ্গল ওয়াঙ্গলের টুপি (The Quangle Wangle’s Hat)

কোয়াঙ্গল ওয়াঙ্গল একটা গাছে বসে ছিল,
তার মাথায় ছিল একটা বিশাল টুপি।
সেই টুপিতে বাসা বেঁধেছিল
পাখি, পোকা, আর অনেক প্রাণী —
সবাই মিলে গান গাইত!

১০. ক্যালিকো পাই (Calico Pie)

ক্যালিকো পাই,
ছোট্ট পাখিরা উড়ে যায়।
ক্যালিকো পাই,
ছোট্ট পাখিরা ফিরে আসে না।
ক্যালিকো পাই,
আমি কাঁদি আর হাসি,
ক্যালিকো পাই —
আমার হৃদয় ভেঙে যায়!

এডওয়ার্ড লিয়ার: ভিক্টোরিয়ান যুগের nonsense কবিতার জনক ও Limerick ফর্মের জনপ্রিয়কারী (Edward Lear, ১৮১২–১৮৮৮)

এডওয়ার্ড লিয়ার ছিলেন ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্যতম সৃজনশীল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব — চিত্রশিল্পী, ভ্রমণকারী, সংগীতশিল্পী এবং সর্বোপরি nonsense কবিতার অগ্রদূত। তিনি Limerick নামক পাঁচ লাইনের হাস্যকর কবিতার ফর্মকে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং আধুনিক nonsense literature-এর ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর কবিতা যুক্তিহীন, কল্পনাপ্রসূত, ছন্দময় ও মজার — যা শিশু ও বড়োদের সমানভাবে আনন্দ দেয়। একই সঙ্গে তাঁর জীবন ছিল একাকীত্ব, অসুস্থতা ও সৃজনশীলতার মিশ্রণ।

শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন (১৮১২–১৮৩০)

১৮১২ সালের ১২ মে লন্ডনের হলওয়েতে জন্মগ্রহণ করেন এডওয়ার্ড লিয়ার। তিনি ছিলেন একুশ সন্তানের মধ্যে বিশতম। পরিবারটি আর্থিকভাবে সংকটে পড়ে যায়। বাবা জেরেমিয়া লিয়ার ছিলেন স্টকব্রোকার, কিন্তু ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ায় পরিবার দরিদ্র হয়ে পড়ে।

শৈশব থেকেই এডওয়ার্ডের স্বাস্থ্য খারাপ ছিল। তিনি এপিলেপসি (মৃগীরোগ), অ্যাজমা ও গভীর বিষণ্ণতায় ভুগতেন। এই অসুস্থতা তাঁকে অনেক সময় একাকী করে রাখত। তবে তিনি ছবি আঁকায় অসাধারণ প্রতিভা দেখান। মাত্র পনেরো-ষোলো বছর বয়সে তিনি পাখির ছবি আঁকতে শুরু করেন এবং পরিবারের আয়ের জন্য এটাই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পেশা।

চিত্রশিল্পী হিসেবে কর্মজীবন (১৮৩০–১৮৪৬)

১৮৩১ সালে মাত্র উনিশ বছর বয়সে তিনি “Illustrations of the Family of Psittacidae” (পাখির ছবির বই) প্রকাশ করেন — যা তাঁকে বিজ্ঞানী ও শিল্পী হিসেবে পরিচিতি দেয়। পরে তিনি লর্ড স্ট্যানলি (আর্ল অফ ডার্বি)-এর Knowsley Hall-এ চাকরি নেন। সেখানে তিনি প্রাণী ও পাখির ছবি আঁকতেন।

Knowsley Hall-এর শিশুরা তাঁর কাছে গল্প ও ছবি চাইত। এই সময় তিনি প্রথম limerick লিখতে শুরু করেন — পাঁচ লাইনের ছোটো, হাস্যকর কবিতা যার ছন্দ AABBA। ১৮৪৬ সালে তিনি “A Book of Nonsense” প্রকাশ করেন। এই বইটি তাঁকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে।

Nonsense কবিতা ও Limerick-এর জনপ্রিয়তা

এডওয়ার্ড লিয়ার Limerick ফর্মকে শুধু ব্যবহার করেননি — তিনি এটাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তাঁর লিমেরিকগুলোতে থাকত অদ্ভুত চরিত্র — দাড়িওয়ালা বুড়ো, গাছের ওপর বসা মানুষ, পেঁচা ও বিড়ালছানা, জাম্বলি ইত্যাদি।

তাঁর বিখ্যাত কবিতা:

  • “The Owl and the Pussycat”
  • “The Jumblies”
  • “The Dong with a Luminous Nose”
  • “The Pobble Who Has No Toes”
  • “The Quangle Wangle’s Hat”

তাঁর কবিতায় যুক্তি নেই, কিন্তু ছন্দ আছে। অযৌক্তিকতা আছে, কিন্তু সুর আছে। এটাই তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান — nonsense poetryকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়া।

ভ্রমণ ও অন্যান্য রচনা

স্বাস্থ্যের কারণে তিনি প্রায় সারাজীবন ভ্রমণ করতেন। তিনি ইউরোপ, গ্রিস, তুরস্ক, মিশর, ভারত ও শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ল্যান্ডস্কেপ ছবি আঁকেন এবং ভ্রমণ বই লেখেন — যেমন “Journals of a Landscape Painter”

তিনি সংগীতও রচনা করতেন এবং নিজের কবিতায় সুর দিতেন। তাঁর কবিতা আজও গান হিসেবে গাওয়া হয়।

ব্যক্তিগত জীবন, স্বাস্থ্য ও একাকীত্ব

এডওয়ার্ড লিয়ার কখনো বিয়ে করেননি। তিনি গভীরভাবে একাকী ছিলেন। তাঁর মৃগীরোগ ও বিষণ্ণতা তাঁকে অনেক সময় বিচ্ছিন্ন করে রাখত। তবে তিনি হাস্যরসের মাধ্যমে নিজের যন্ত্রণাকে রূপান্তরিত করতেন। তিনি নিজেকে “The Poet of Nonsense” বলে পরিচয় দিতেন এবং নিজের ছবিতে নিজেকে হাস্যকরভাবে আঁকতেন।

তাঁর জীবনের শেষের দিকে তিনি ইতালির San Remo-তে বসবাস করতেন।

শেষ জীবন ও মৃত্যু (১৮৮০–১৮৮৮)

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়। ১৮৮৮ সালের ২৯ জানুয়ারি সান রেমোতে তিনি মারা যান। তাঁকে সান রেমোর ইংরেজ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

উত্তরাধিকার

এডওয়ার্ড লিয়ার আজও nonsense literature-এর জনক হিসেবে স্মরণীয়। তিনি Limerick ফর্মকে আধুনিক রূপ দিয়েছেন — যা পরবর্তীকালে লুইস ক্যারল, স্পাইক মিলিগান, ড. সিউস প্রমুখকে প্রভাবিত করেছে।

তাঁর কবিতা শুধু হাসায় না — এতে এক ধরনের মৃদু বিষণ্ণতা ও স্বপ্নের ছোঁয়া আছে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে “অর্থহীন” কথাও শিল্প হতে পারে, যদি তাতে ছন্দ, কল্পনা ও হৃদয় থাকে।

উপসংহার
এডওয়ার্ড লিয়ার ছিলেন একজন মানুষ যিনি নিজের যন্ত্রণাকে হাসিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। তিনি Victorian nonsense poet যিনি Limerick ফর্মকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন এবং আধুনিক শিশু সাহিত্য ও হাস্যরসাত্মক কবিতার পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁর কবিতা আজও পাঠককে শিশু করে তোলে — যেখানে যুক্তি নেই, কিন্তু আনন্দ আছে।

Leave a Comment