তারাস শেভচেঙ্কো (Taras Shevchenko, ১৮১৪–১৮৬১)
— আধুনিক ইউক্রেনীয় সাহিত্যের অবিসংবাদিত সাংস্কৃতিক স্তম্ভ। তিনি ইউক্রেনীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার জন্য লড়াই করেছেন। তাঁর কবিতা “Kobzar” ইউক্রেনীয় জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তিনি দাসত্ব থেকে উঠে আসা একজন কবি-শিল্পী, যিনি রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সাহসী কথা বলেছেন।
১. আমার উইল / জাপোভিত (Zapovit / My Testament)
ইউক্রেনের জন্য চিরন্তন আহ্বান
যখন আমি মরে যাব, আমাকে কবর দিও
আমার প্রিয় ইউক্রেনে,
উঁচু ঢিবির উপর আমার সমাধি,
বিস্তৃত সমভূমির মাঝে —
যাতে মাঠ, অসীম স্তেপ,
ডিনিপারের খাড়া তীর
আমার চোখ দেখতে পায়, কান শুনতে পায়
নদীর গর্জন।
যখন ইউক্রেন থেকে ডিনিপার বয়ে নিয়ে যায়
নীল সমুদ্রে শত্রুদের রক্ত…
তখন আমি ছেড়ে যাব এই পাহাড় ও উর্বর ক্ষেত —
সব ছেড়ে উড়ে যাব ঈশ্বরের বাসস্থানে।
আর তখন প্রার্থনা করব… কিন্তু সেই দিন পর্যন্ত
আমি ঈশ্বর সম্পর্কে কিছু জানি না।
ওহে আমাকে কবর দাও, তারপর উঠে দাঁড়াও
এবং তোমাদের ভারী শৃঙ্খল ভাঙো।
শত্রুদের রক্ত দিয়ে জল দাও স্বাধীনতাকে
যা তোমরা অর্জন করেছ।
আর মহান নতুন পরিবারে, স্বাধীনদের পরিবারে,
নরম কথায়, দয়ালু শব্দে আমাকেও স্মরণ করো।
২. স্বপ্ন (The Dream / Son)
জাতীয় স্বপ্ন ও বাস্তবতার বেদনা
আমি স্বপ্ন দেখেছি — একটি সুন্দর স্বপ্ন।
আমি দেখেছি ইউক্রেনের সোনালি মাঠ,
ডিনিপারের নীল জল,
আর মানুষের মুখে হাসি।
কিন্তু জেগে উঠে দেখি —
চারপাশে অন্ধকার, শৃঙ্খল আর কান্না।
তবু আমি স্বপ্ন দেখি…
কারণ স্বপ্নই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
৩. ককেশাস (The Caucasus)
সাম্রাজ্যবাদ ও স্বাধীনতার সংগ্রাম
ককেশাসের পাহাড়ে রক্ত ঝরে,
রুশ সৈন্যরা আসে — আগুন ও তলোয়ার নিয়ে।
কিন্তু সেখানকার মানুষ লড়াই করে।
তারা বলে — “আমাদের স্বাধীনতা চাই।”
হে ইউক্রেন! তুমিও দেখো এই দৃশ্য।
তোমারও একদিন এই লড়াই আসবে।
৪. মৃত, জীবিত ও অনাগতদের প্রতি (To the Dead, to the Living, and to Those Yet Unborn)
জাতির প্রতি আহ্বান
হে মৃতরা! তোমরা শুয়ে আছো মাটির নিচে।
হে জীবিতরা! তোমরা এখনো শৃঙ্খলে বাঁধা।
হে অনাগতরা! তোমরা এখনো জন্মাওনি।
তবু আমি বলি — জেগে ওঠো!
ভাঙো শৃঙ্খল!
তৈরি করো নতুন ইউক্রেন —
স্বাধীন, মুক্ত ও গর্বিত।
৫. কাতেরিনা (Kateryna)
নারীর বেদনা ও জাতীয় দুর্দশা
কাতেরিনা — একটি সুন্দর নাম।
সে ভালোবাসত এক রুশ সৈন্যকে।
কিন্তু সে তাকে ছেড়ে চলে গেল।
কাতেরিনা একা রইল — লজ্জা ও দুঃখ নিয়ে।
হে ইউক্রেন! তোমারও এই অবস্থা।
তুমি বিশ্বাস করেছিলে — কিন্তু প্রতারিত হয়েছ।
৬. হাইদামাকি (Haidamaky)
বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার গান
হাইদামাকিরা — ইউক্রেনের বিদ্রোহী সন্তান।
তারা অস্ত্র হাতে নিয়েছে।
তারা বলে — “আমাদের জমি, আমাদের স্বাধীনতা।”
রক্ত ঝরে, আগুন জ্বলে —
কিন্তু তারা লড়াই করে।
হে ইউক্রেন! তুমিও এই পথে হাঁটো।
৭. আমার কাছে সব একই (Meni odnakovo / It Makes No Difference to Me)
নির্বাসনের বেদনা ও স্থিতধীতা
আমার কাছে সব একই —
রুশ সাম্রাজ্যের কারাগার বা ইউক্রেনের মাঠ।
আমি নির্বাসিত — কিন্তু আমার আত্মা মুক্ত।
আমি গান গাই — ইউক্রেনের গান।
আমি লিখি — ইউক্রেনের কথা।
তারা আমাকে থামাতে পারবে না।
৮. আমার চিন্তা, আমার চিন্তা (Dumy moi, dumy moi)
কবির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দেশপ্রেম
আমার চিন্তা, আমার চিন্তা —
তোমরা কোথায় উড়ে যাও?
তোমরা ইউক্রেনের মাঠে উড়ো,
তোমরা ডিনিপারের তীরে বসো।
তোমরা বলো — “জেগে ওঠো, ইউক্রেন!”
আমি শুনি — আর আমার হৃদয় জ্বলে ওঠে।
৯. রাত (The Night)
নির্বাসনের একাকীত্ব
রাত নেমে এসেছে।
আমি একা — দূর দেশে।
চাঁদ জ্বলছে, তারা জ্বলছে।
কিন্তু আমার হৃদয়ে অন্ধকার।
আমি ইউক্রেনের কথা ভাবি।
আমি স্বপ্ন দেখি — একদিন ফিরে যাব।
১০. কবির উইল (কবিতার সারাংশ)
জীবন ও মৃত্যুর দর্শন
যখন আমি মরব,
আমাকে মনে রেখো —
যে লড়াই করেছে ইউক্রেনের জন্য।
যে গান গেয়েছে স্বাধীনতার গান।
যে বিশ্বাস করেছে — একদিন ইউক্রেন মুক্ত হবে।
আর সেই দিন যখন আসবে,
তখন আমার নাম নিয়ে গর্ব করো।
তারাস শেভচেঙ্কো: আধুনিক ইউক্রেনীয় সাহিত্যের অবিসংবাদিত সাংস্কৃতিক স্তম্ভ (Taras Shevchenko, ১৮১৪–১৮৬১)
তারাস হ্রিহোরোভিচ শেভচেঙ্কো ছিলেন ইউক্রেনের জাতীয় কবি, চিত্রশিল্পী ও চিন্তাবিদ। তিনি আধুনিক ইউক্রেনীয় সাহিত্য ও জাতীয় চেতনার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। দাসত্ব থেকে উঠে আসা এই মানুষটি ইউক্রেনীয় ভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছেন, রুশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সাহসী কথা বলেছেন এবং ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর কবিতা “Kobzar” আজও ইউক্রেনীয় জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
শৈশব ও দাসত্বের জীবন (১৮১৪–১৮৩১)
১৮১৪ সালের ৯ মার্চ (পুরনো রীতিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি) ইউক্রেনের চেরকাসি অঞ্চলের মোরিনৎসি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তারাস শেভচেঙ্কো। তিনি ছিলেন এক দরিদ্র দাস (serf) পরিবারের সন্তান। বাবা হ্রিহোরি শেভচেঙ্কো ও মা কাতেরিনা ছিলেন দাস। শৈশবে তিনি পিতামাতাকে হারান — মা মারা যান যখন তাঁর বয়স ৯, বাবা মারা যান ১১ বছর বয়সে।
দাস হিসেবে তিনি কঠিন শৈশব কাটান। প্রথমে গ্রামের পাদরির কাছে পড়াশোনা শুরু করেন, কিন্তু পরে বিভিন্ন বাড়িতে চাকরি করতে হয়। তিনি ভেড়া চরাতেন, জমিতে কাজ করতেন। এই কঠিন জীবন তাঁর মনে গভীর দাগ কাটে। তবে শৈশব থেকেই তিনি ছবি আঁকায় আগ্রহী ছিলেন — দেওয়ালে, কাগজে যা পেতেন তাতেই আঁকতেন।
শিল্পী হিসেবে উত্থান ও দাসত্ব থেকে মুক্তি (১৮৩১–১৮৩৮)
১৮৩১ সালে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গে চলে যান একজন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে। সেখানে তিনি বিখ্যাত শিল্পী কার্ল ব্রিয়ুল্লভের সঙ্গে পরিচিত হন। ব্রিয়ুল্লভ ও অন্যান্য শিল্পী-বুদ্ধিজীবী (যেমন কবি ভাসিলি ঝুকভস্কি) তাঁর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন। তারা অর্থ সংগ্রহ করে ১৮৩৮ সালে তাঁকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন — ২৫০০ রুবল দিয়ে তাঁর মালিকের কাছ থেকে কিনে নেন।
এই মুক্তি ছিল তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। তিনি ইম্পেরিয়াল একাডেমি অফ আর্টসে ভর্তি হন এবং চিত্রকলায় দক্ষতা অর্জন করেন। একই সময়ে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন — ইউক্রেনীয় ভাষায়।
“Kobzar” ও সাহিত্যকর্ম — ইউক্রেনীয় জাতীয় চেতনার জন্ম
১৮৪০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “Kobzar” (কবজার — গায়কের নাম)। এই বইটি ইউক্রেনীয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এতে তিনি ইউক্রেনের ইতিহাস, লোককথা, প্রকৃতি ও জনগণের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরেন।
প্রধান রচনা:
- “Haidamaky” — ইউক্রেনীয় বিদ্রোহীদের কাহিনি
- “Kateryna” — নারীর দুর্দশা ও সামাজিক অন্যায়
- “The Dream” (Son) — রুশ সাম্রাজ্যের সমালোচনা
- “The Caucasus” — সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
- “Epistle” — ইউক্রেনীয়দের প্রতি আহ্বান
- “Zapovit” (Testament) — তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা, যেখানে তিনি ইউক্রেনের মাটিতে কবর পেতে চেয়েছেন এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর কবিতা ইউক্রেনীয় ভাষাকে সাহিত্যিক মর্যাদা দেয় এবং জাতীয় চেতনা জাগায়। রুশ সরকার তাঁকে “বিপজ্জনক” বলে মনে করে।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও নির্বাসন (১৮৪৭–১৮৫৭)
১৮৪৬ সালে তিনি গোপন সংগঠন “Brotherhood of Saints Cyril and Methodius”-এর সদস্য হন। এই সংগঠন ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও স্লাভিক জাতিগুলোর মুক্তির পক্ষে ছিল। ১৮৪৭ সালে সংগঠনটি ধরা পড়লে শেভচেঙ্কোকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাঁকে ১০ বছরের নির্বাসনে পাঠানো হয় — প্রথমে ওরেনবুর্গ, পরে নভোপেত্রভস্ক দুর্গে। তাঁকে লেখালেখি ও ছবি আঁকা নিষিদ্ধ করা হয়। এই সময় তিনি গোপনে কবিতা লিখতেন (যেমন “The Dream”, “The Caucasus”)। নির্বাসনের কষ্ট তাঁর স্বাস্থ্য নষ্ট করে, কিন্তু তিনি আত্মসমর্পণ করেননি।
মুক্তি ও শেষ জীবন (১৮৫৭–১৮৬১)
১৮৫৭ সালে সম্রাট দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের সাধারণ ক্ষমায় তিনি মুক্তি পান। কিন্তু স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় তিনি ইউক্রেনে ফিরে যেতে পারেননি। সেন্ট পিটার্সবার্গে থেকে লেখালেখি চালিয়ে যান। ১৮৬০ সালে তিনি ইম্পেরিয়াল একাডেমি অফ আর্টসের সদস্য নির্বাচিত হন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৮৬১ সালের ১০ মার্চ (তাঁর ৪৭তম জন্মদিনের পরদিন) সেন্ট পিটার্সবার্গে তিনি মারা যান — সম্ভবত যক্ষ্মায়। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাঁকে ইউক্রেনের কানিভে ডিনিপার নদীর তীরে একটি উঁচু পাহাড়ে সমাহিত করা হয় (তাঁর “Zapovit” কবিতা অনুসারে)।
তাঁর মৃত্যুর পর ইউক্রেনজুড়ে শোকের ঢেউ বয়ে যায়। আজ তিনি ইউক্রেনের জাতীয় বীর। তাঁর কবিতা ইউক্রেনীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। “Kobzar” ইউক্রেনীয় জাতীয় চেতনার বাইবেল হিসেবে বিবেচিত। তাঁর “Zapovit” ইউক্রেনের অনানুষ্ঠানিক জাতীয় সঙ্গীতের মতো।
তারাস শেভচেঙ্কো ছিলেন শুধু একজন কবি নন — তিনি ছিলেন ইউক্রেনের আত্মা। দাসত্ব থেকে উঠে এসে তিনি ইউক্রেনীয় ভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদা দিয়েছেন, জাতীয় চেতনা জাগিয়েছেন এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাঁর কবিতা আজও ইউক্রেনীয়দের অনুপ্রাণিত করে — “জেগে ওঠো, ইউক্রেন!” তিনি সত্যিই আধুনিক ইউক্রেনীয় সাহিত্যের অবিসংবাদিত সাংস্কৃতিক স্তম্ভ।