উইলিয়াম ব্লেকের ১০টি বিখ্যাত কবিতা
ইলিয়াম ব্লেক (১৭৫৭–১৮২৭) ছিলেন একজন দর্শনীয় শিল্পী ও রহস্যময় কবি। তাঁর Songs of Innocence (১৭৮৯) ও Songs of Experience (১৭৯৪) শিশুসুলভ নির্দোষতা ও জীবনের অভিজ্ঞতার গভীর দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। তিনি নিজে আলোকিত মুদ্রণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে লেখা ও ছবিকে একসঙ্গে সৃষ্টি করেছিলেন।
১. The Lamb
William Blake
(মেষশাবক)
ছোট মেষশাবক, কে তোমাকে বানিয়েছে?
কে তোমাকে এত নরম করে গড়েছে?
কে তোমাকে এত মিষ্টি কণ্ঠ দিয়েছে,
যে তুমি মৃদু সুরে গান গাও?
কে তোমাকে এত উজ্জ্বল করে তুলেছে,
যে তুমি নদীর ধারে চরে বেড়াও?
কে তোমাকে এত নরম পশম দিয়েছে,
যে তুমি সোনালি আলোয় চকচক করো?
ছোট মেষশাবক, বলো তো, কে তোমাকে বানিয়েছে?
কে তোমাকে এত ভালোবাসে?
কে তোমার মতোই ছোট হয়ে এসেছিল,
এবং তোমার নাম নিয়েছিল?
ঈশ্বর তোমাকে বানিয়েছেন, ছোট মেষশাবক।
তিনি তোমার মতোই নরম ও ভালো।
তিনি তোমার মতোই শিশু হয়ে এসেছিলেন,
এবং তোমার নাম নিয়েছিলেন।
ছোট মেষশাবক, ঈশ্বর তোমাকে আশীর্বাদ করুন।
তুমি তাঁর সন্তান, তুমি তাঁর আনন্দ।
২. The Tyger
William Blake
(বাঘ)
বাঘ! বাঘ! জ্বলন্ত আগুনে জ্বলছ,
রাতের অন্ধকার বনে কোন বনের গভীরে?
কোন অমর হাত বা চোখ
তোমার ভয়ংকর প্রতিসাম্য তৈরি করতে পারে?
কোন দূর আকাশে বা গভীর সমুদ্রে
তোমার চোখের আগুন জ্বলে উঠল?
কোন ডানায় সাহস পেল সে উড়তে?
কোন হাত সাহস পেল আগুন ধরাতে?
কোন কাঁধ, কোন শিল্পী হাত
তোমার হৃদয়ের পেশি বুনতে পারে?
যখন তোমার হৃদয় প্রথম ধড়ফড় করল,
কোন ভয়ংকর হাতুড়ি, কোন শৃঙ্খল?
কোন কামারের হাতুড়ি? কোন শৃঙ্খল?
কোন চুল্লি তোমার মস্তিষ্ক ধরে রাখল?
কোন ভয়ংকর হাত, কোন ভয়ংকর পা
তোমার হৃদয়ের ভয়ংকর আগুন ধরিয়ে দিল?
যখন তারা তারা ছড়িয়ে পড়ল আকাশে
এবং স্বর্গের জল কাঁদতে লাগল,
সে কি হাসল তার কাজ দেখে?
যে বাঘ বানাল, সে কি মেষও বানিয়েছিল?
বাঘ! বাঘ! জ্বলন্ত আগুনে জ্বলছ,
রাতের অন্ধকার বনে কোন বনের গভীরে?
কোন অমর হাত বা চোখ
তোমার ভয়ংকর প্রতিসাম্য তৈরি করতে পারে?
৩. London
William Blake
(লন্ডন)
আমি ঘুরে বেড়াই প্রতিটি চার্টার্ড রাস্তায়,
প্রতিটি চার্টার্ড রাস্তায়,
যেখানে থেমে থাকা টেমস নদী প্রবাহিত হয়।
প্রতিটি মুখে, প্রতিটি মানুষের মুখে
আমি দুর্বলতার চিহ্ন দেখি, দুর্বলতার চিহ্ন।
প্রতিটি কান্নায়, প্রতিটি শিশুর কান্নায়,
প্রতিটি কণ্ঠে, প্রতিটি নিষেধাজ্ঞায়,
মনের শৃঙ্খল শোনা যায়।
কামারের হাতুড়ির শব্দে
প্রতিটি শিশুর কান্না শোনা যায়।
প্রতিটি গির্জার কালো দেওয়ালে
এবং প্রতিটি প্রাসাদের কালো দেওয়ালে
আমি শুনতে পাই যুবক-যুবতীর দীর্ঘশ্বাস,
যা রক্তাক্ত ক্ষতের মতো দাগ ফেলে।
প্রতিটি নবজাতকের কান্নায়
এবং প্রতিটি বিবাহের শয্যায়
আমি শুনতে পাই মৃত্যুর গাড়ির চাকার শব্দ,
যা নির্দোষতাকে চূর্ণ করে দেয়।
৪. The Sick Rose
William Blake
(অসুস্থ গোলাপ)
ওহে অসুস্থ গোলাপ, অদৃশ্য কীট
রাতের অন্ধকারে তোমার বিছানায় এসেছে।
তার গোপন প্রেম তোমার জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে,
এবং তোমার গাঢ় লাল রং ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
৫. A Poison Tree
William Blake
(বিষবৃক্ষ)
আমি আমার ক্রোধকে বললাম, আর তা শেষ হয়ে গেল।
আমি আমার ক্রোধকে লুকিয়ে রাখলাম, আর তা বেড়ে উঠল।
দিনে-রাতে আমি জল দিলাম ভয় ও কান্না দিয়ে,
এবং সূর্যের আলো দিয়ে — হাসি ও মিথ্যা কথা দিয়ে।
এবং তা বেড়ে উঠল দিনে-রাতে,
যতক্ষণ না এটি একটি গাছ হয়ে গেল।
এবং আমার শত্রু এটি দেখতে পেল,
এবং সে জানত যে এটি আমার।
এবং সে রাতে আমার বাগানে এল,
এবং সে চুরি করে আমার ফল খেল।
এবং সকালে সে মৃত হয়ে পড়ে ছিল।
৬. The Chimney Sweeper (Songs of Innocence)
William Blake
(চিমনি ঝাড়ুকার — নির্দোষতা)
যখন আমার মা মারা গেল তখন আমি খুব ছোট ছিলাম,
এবং আমার বাবা আমাকে বিক্রি করে দিল,
যখন আমার জিভ এখনও কথা বলতে শেখেনি।
তাই আমি কালো ব্যাগ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুরে বেড়াতাম।
“ঝাড়ু! ঝাড়ু!” বলে চিৎকার করতাম রাস্তায়,
যতক্ষণ না টম ডেকার নামে আরেকটি ছেলে এল,
যে কালো ছিল মাথা থেকে পা পর্যন্ত।
এবং সে কাঁদতে লাগল, আর আমি তাকে সান্ত্বনা দিলাম।
এবং সে রাতে স্বপ্ন দেখল — হাজার হাজার ছেলে
সব কালো কফিনে শুয়ে আছে,
এবং একজন দেবদূত এসে তাদের তালা খুলে দিল,
এবং তারা সব সবুজ মাঠে নাচতে লাগল।
এবং দেবদূত বলল, “তোমরা যদি ভালো হয়ে থাকো,
তাহলে ঈশ্বর তোমাদের স্বর্গে নিয়ে যাবেন,
যেখানে সূর্য কখনও অস্ত যায় না,
এবং তোমরা আর কখনও কাঁদবে না।”
৭. Holy Thursday (Songs of Innocence)
William Blake
(পবিত্র বৃহস্পতিবার)
যেদিন দরিদ্র শিশুরা সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে যায়,
তাদের লাল, নীল ও সবুজ রঙের পোশাকে,
তাদের মাথায় ফুলের মুকুট,
তারা যখন গান গায় — “হ্যালেলুজাহ!”
তখন মনে হয় যেন স্বর্গ থেকে দেবদূতরা নেমে এসেছে,
এবং পৃথিবীর সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু যখন তারা ফিরে যায় তাদের অন্ধকার ঘরে,
তখন কি ঈশ্বর তাদের কথা ভুলে যান?
৮. The Divine Image
William Blake
(ঐশ্বরিক প্রতিমূর্তি)
দয়া, করুণা, শান্তি ও ভালোবাসা
ঈশ্বরের চারটি গুণ।
এবং মানুষের মধ্যে এই চারটি গুণ
ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি।
দয়া যখন মানুষের হৃদয়ে থাকে,
তখন সে ঈশ্বরকে দেখতে পায়।
করুণা যখন মানুষের চোখে থাকে,
তখন সে ঈশ্বরকে চিনতে পারে।
৯. Nurse’s Song (Songs of Innocence)
William Blake
(নার্সের গান)
যখন শিশুরা হাসতে হাসতে খেলা করে মাঠে,
এবং তাদের কণ্ঠস্বর বাতাসে ভেসে বেড়ায়,
তখন আমার হৃদয় আনন্দে ভরে যায়।
আমি তাদের ডেকে বলি, “এসো, এসো, ছোট্ট সোনারা!”
কিন্তু তারা বলে, “আর একটু খেলতে দাও, নার্স!
সূর্য এখনও অস্ত যায়নি।”
আমি তাদের কথা শুনে হাসি,
এবং বলি, “ঠিক আছে, খেলো।”
১০. The Clod and the Pebble
William Blake
(মাটির ঢেলা ও নুড়ি পাথর)
“ভালোবাসা খুশি খুশি করে,
এবং খুশি খুশি করে অন্যদের।
ভালোবাসা নিজেকে ভুলে যায়,
এবং অন্যদের সুখ খুঁজে পায়।”
একটি নুড়ি পাথর বলল, “ভালোবাসা নিজেকে খুঁজে পায়,
এবং নিজেকে খুঁজে পায় অন্যদের মধ্যে।
ভালোবাসা নিজেকে আনন্দ দেয়,
এবং অন্যদের দুঃখ দেয়।”
একটি মাটির ঢেলা বলল, “ভালোবাসা নরম হয়,
এবং নরম হয়ে অন্যদের জন্য জায়গা করে দেয়।
ভালোবাসা নিজেকে ভুলে যায়,
এবং অন্যদের সুখে আনন্দ পায়।”
উইলিয়াম ব্লেক (William Blake, ১৭৫৭–১৮২৭)
দর্শনীয় শিল্পী, রহস্যময় কবি ও আলোকিত মুদ্রণশিল্পের উদ্ভাবক
উইলিয়াম ব্লেক ছিলেন ইংরেজি সাহিত্য ও শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে অনন্য ও রহস্যময় ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি শুধু কবি বা চিত্রশিল্পী ছিলেন না — তিনি ছিলেন একজন দর্শনীয় (visionary) মানুষ, যিনি শৈশব থেকেই অলৌকিক দৃষ্টি লাভ করেছিলেন এবং সারা জীবন সেই দৃষ্টিকে শিল্প ও কবিতায় রূপ দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত সংকলন Songs of Innocence (১৭৮৯) শিশুসুলভ নির্মলতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে, যদিও তাঁর সম্পূর্ণ রচনায় নির্দোষতা ও অভিজ্ঞতার (Innocence and Experience) গভীর দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
জন্ম ও শৈশব: দর্শনের প্রথম আলো
১৭৫৭ সালের ২৮ নভেম্বর লন্ডনের সোহো অঞ্চলে উইলিয়াম ব্লেক জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা জেমস ব্লেক ছিলেন একজন হোসিয়ার (মোজা বিক্রেতা) এবং মা ক্যাথরিন ব্লেক। পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত, কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে সংবেদনশীল। ব্লেকের শৈশব ছিল অসাধারণ। মাত্র চার বছর বয়সে তিনি জানালার বাইরে ঈশ্বরকে দেখতে পান। আট-দশ বছর বয়সে একদিন তিনি একটি গাছকে দেবদূতদের দ্বারা পূর্ণ দেখতে পান — গাছের প্রতিটি ডালে উজ্জ্বল দেবদূত বসে আছে। আরেকবার তিনি নবী হিজকিয়েলকে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন।
এই দর্শনগুলো তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কল্পনা (Imagination) হলো ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় দান এবং বাস্তবতার চেয়েও বেশি সত্য। পরবর্তীকালে তিনি লিখেছিলেন, “The imagination is not a State: it is the Human existence itself.”
শিক্ষা ও শিল্পপ্রশিক্ষণ
ব্লেকের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা খুবই সীমিত ছিল। তিনি সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করেননি। বরং দশ বছর বয়সে তাঁকে ড্রয়িং স্কুলে ভর্তি করা হয়। ১৭৭২ সালে তিনি বিখ্যাত খোদাইশিল্পী (engraver) জেমস বেসায়ারের কাছে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন। সাত বছর ধরে তিনি এই প্রশিক্ষণ নেন। এ সময় তিনি ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে গথিক স্মৃতিস্তম্ভের খোদাইকাজ করেন, যা তাঁর শিল্পে গথিক ও মধ্যযুগীয় প্রভাব ফেলে।
১৭৭৯ সালে তিনি রয়্যাল অ্যাকাডেমিতে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ভর্তি হন, কিন্তু স্যার জোশুয়া রেনল্ডসের শিক্ষাদর্শের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়। ব্লেক বিশ্বাস করতেন যে শিল্প হবে আধ্যাত্মিক ও কল্পনাপ্রসূত, শুধু প্রকৃতির অনুকরণ নয়।
বিবাহ ও জীবনসঙ্গী ক্যাথরিন
১৭৮২ সালে ব্লেক ক্যাথরিন বুশারকে বিয়ে করেন। ক্যাথরিন ছিলেন একজন সাধারণ মেয়ে, যিনি পড়তে-লিখতে জানতেন না। ব্লেক তাঁকে শিখিয়েছিলেন পড়া, লেখা এবং খোদাইকাজ। তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর আধ্যাত্মিক ও সৃজনশীল অংশীদারিত্ব। ক্যাথরিন তাঁর সব কাজে সহায়তা করতেন — কাগজ রং করা, ছাপা, এমনকি তাঁর দর্শনের কথা শোনা। ব্লেক বলতেন, “ক্যাথরিন আমার স্বর্গীয় সঙ্গী।”
আলোকিত মুদ্রণ পদ্ধতির উদ্ভাবন ও Songs of Innocence
১৭৮৮ সালে ব্লেক একটি বিপ্লবী মুদ্রণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যাকে তিনি “Illuminated Printing” বা “Relief Etching” বলে অভিহিত করেন। এতে তিনি তামার প্লেটে লেখা ও ছবি একসঙ্গে খোদাই করে রঙিন ছাপ তৈরি করতেন। এর ফলে প্রতিটি বই হয়ে উঠত একটি শিল্পকর্ম — লেখা ও ছবি অবিচ্ছেদ্য।
১৭৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সংকলন Songs of Innocence। এতে শিশুসুলভ নির্দোষতা, প্রকৃতি ও ঐশ্বরিক ভালোবাসার কবিতা আছে — “The Lamb”, “The Chimney Sweeper”, “Holy Thursday” ইত্যাদি। কিন্তু এই নির্দোষতার পেছনে সমাজের অন্ধকারের ইঙ্গিতও লুকিয়ে আছে।
১৭৯৪ সালে তিনি Songs of Experience প্রকাশ করেন। এতে “The Tyger”, “London”, “The Sick Rose” এর মতো কবিতায় অভিজ্ঞতার জগত — শোষণ, দুর্নীতি, শিল্পায়নের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। দুটি সংকলন একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায় ব্লেকের দর্শন: “Without Contraries is no progression.” (বিপরীত ছাড়া অগ্রগতি নেই।)
দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
ব্লেক ছিলেন তীব্রভাবে স্বাধীনচেতা। তিনি আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবকে সমর্থন করেছিলেন। তিনি রাজতন্ত্র, প্রতিষ্ঠিত গির্জা, শিল্পায়ন ও বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের (Newton, Locke, Bacon) তীব্র সমালোচক ছিলেন। তাঁর মতে, যুক্তি (Reason) যখন কল্পনাকে দমন করে, তখন তা হয়ে ওঠে অত্যাচারী — যাকে তিনি Urizen নামে প্রতীকী চরিত্রে ফুটিয়েছেন।
তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী গদ্য-কাব্য The Marriage of Heaven and Hell (১৭৯০-৯৩) এই দর্শনের সারাংশ। এতে তিনি বলেন, “The road of excess leads to the palace of wisdom.” এবং “If the doors of perception were cleansed everything would appear to man as it is, infinite.”
ফেলফাম যুগ ও বিচার
১৮০০ সালে পৃষ্ঠপোষক উইলিয়াম হেলির আমন্ত্রণে ব্লেক সাসেক্সের ফেলফামে চলে যান। এখানে তিনি Milton কাব্য রচনা শুরু করেন, কিন্তু হেলির সঙ্গে মতবিরোধ হয়। ১৮০৩ সালে এক সৈনিকের সঙ্গে ঝগড়ায় তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। বিচারে তিনি খালাস পান, কিন্তু এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে।
পরবর্তী জীবন: দারিদ্র্যের মধ্যে সৃষ্টি
লন্ডনে ফিরে ব্লেক চরম দারিদ্র্যে জীবন কাটান। তবু তিনি সৃষ্টি চালিয়ে যান। ১৮০৪-১৮২০ সালের মধ্যে তিনি তাঁর সবচেয়ে বড় ও জটিল রচনা Jerusalem সম্পন্ন করেন — ১০০টি প্লেটের এক বিশাল আধ্যাত্মিক মহাকাব্য। এছাড়া তিনি বাইবেল, জবের বই (Book of Job) এবং দান্তের Divine Comedy-এর অসাধারণ জলরঙের চিত্র অঙ্কন করেন (শেষেরটি অসম্পূর্ণ রয়ে যায়)।
The Ancient of Days (১৭৯৪) তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত একক চিত্রকর্ম, যেখানে ঈশ্বরকে কম্পাস দিয়ে বিশ্ব সৃষ্টি করতে দেখা যায় — যুক্তি ও সৃষ্টির দ্বন্দ্বের প্রতীক।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৮২৭ সালের ১২ আগস্ট উইলিয়াম ব্লেক মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর মুহূর্তে তিনি স্ত্রী ক্যাথরিনকে বলেছিলেন, “Stay, Kate! Keep just as you are — I will draw your portrait.” তাঁকে লন্ডনের বানহিল ফিল্ডসে সমাহিত করা হয়।
জীবদ্দশায় ব্লেক প্রায় অখ্যাত ছিলেন। তাঁর সমসাময়িকরা তাঁকে “পাগল” বলে মনে করত। কিন্তু ১৯শ শতাব্দীর শেষে প্রি-রাফায়েলাইটরা তাঁকে পুনরাবিষ্কার করে। ২০শ শতাব্দীতে আলডাস হাক্সলি, অ্যালেন গিন্সবার্গ, বব ডিলান প্রমুখ তাঁকে প্রভাবশালী বলে স্বীকার করেন। আজ তিনি রোমান্টিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক-শিল্পী হিসেবে বিবেচিত — যিনি দেখিয়েছেন যে কল্পনাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ব্লেকের জীবন ও শিল্প আমাদের শেখায়: বাস্তবতা শুধু চোখে দেখা নয়, হৃদয় ও কল্পনায় অনুভব করা। তিনি ছিলেন সত্যিকারের রহস্যময় দর্শনীয় — যিনি অন্ধকারের মধ্যেও আলোর সন্ধান করেছেন এবং সেই আলোকে শব্দ ও রঙে রূপ দিয়েছেন।