কম বয়সী স্বনির্ভর নারী বিলিয়নেয়ারের গল্প

হুইটনি ওল্ফ হার্ড: বাম্বল-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী স্বনির্ভর নারী বিলিয়নেয়ারের গল্প

হুইটনি ওল্ফ হার্ড আমাদের প্রজন্মের একজন অন্যতম সেরা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। তিনি বিখ্যাত ডেটিং অ্যাপ ‘টিন্ডার’ (Tinder) তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু কর্মজীবনে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েও তিনি দমে যাননি। পরে তিনি ‘বাম্বল’ (Bumble) নামের একটি নতুন অ্যাপ তৈরি করেন। এই অ্যাপটি মেয়েদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে অনলাইন ডেটিংয়ের পুরো ধারণাই বদলে দেয়। ২০২১ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে তিনি বাম্বল-এর সিইও (CEO) হিসেবে কোম্পানির শেয়ার বাজারে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ‘স্বনির্ভর’ (নিজের চেষ্টায় হওয়া) নারী বিলিয়নেয়ার বা কোটিপতি হওয়ার রেকর্ড গড়েন। এই প্রশ্নোত্তর আলোচনাটিতে তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

সল্টলেক সিটিতে হুইটনির ছোটবেলা এবং পারিবারিক পরিবেশ কেমন ছিল?

হুইটনি ওল্ফ ১৯৮৯ সালের ১ জুলাই আমেরিকার উটাহ রাজ্যের সল্টলেক সিটিতে জন্ম নেন। তাঁর বাবার নাম মাইকেল এবং মায়ের নাম কেলি ওল্ফ। তিনি যে সমাজে বড় হয়েছেন, সেটি বেশ রক্ষণশীল ছিল। সেখানে ছেলেদের কথাই শেষ কথা বলে গণ্য হতো। তাঁর বাবা খেলাধুলার সামগ্রীর ব্যবসা করতেন। তাই ছোটবেলা থেকেই হুইটনি পরিবারের সাথে পাহাড়ে স্কিইং ও ক্যাম্পিং করতে যেতেন। এতে তাঁর মধ্যে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ক্ষমতা তৈরি হয়। তাঁর মা ছিলেন ক্যাথলিক আর বাবা ছিলেন ইহুদি। এই ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশের কারণে তিনি ছোটবেলা থেকেই মানুষের পরিচয় ও সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাবতে শেখেন।

ছোটবেলায় তিনি সাধারণ রাজকুমারীদের গল্পের চেয়ে ওয়াল্ট ডিজনির রূপকথার জগত কীভাবে তৈরি হতো, তা নিয়ে বেশি ভাবতেন। এই ভাবনাই পরে তাঁকে ‘বাম্বল’ অ্যাপটিকে শুধু একটি প্রোডাক্ট হিসেবে নয়, বরং মেয়েদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশ হিসেবে তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। স্কুলের দিনগুলো তাঁর মধ্যে ভালো মূল্যবোধ তৈরি করলেও, সমাজের ভেদাভেদগুলোও তাঁর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল।

পড়াশোনার অভিজ্ঞতা এবং প্রথম দিকের ব্যর্থতা কীভাবে তাঁর চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছিল?

স্কুল শেষ করে হুইটনি ড্যালাসের সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটিতে (SMU) ভর্তি হন। তিনি প্রথমে মার্কেটিং বা বিজ্ঞাপন নিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি বড় পরীক্ষায় ভালো করতে না পারায় তিনি সেই সুযোগ পাননি। এই ব্যর্থতা থেকে তিনি শেখেন যে, একটি রাস্তা বন্ধ হলে অন্য আরেকটি ভালো রাস্তা খুলে যায়। এরপর তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি) নিয়ে পড়াশোনা করেন। এর ফলে তিনি মানুষের আচরণ এবং বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি তাঁর এক বন্ধুর সাথে মিলে ‘হেল্প আস প্রজেক্ট’ (Help Us Project) নামে একটি অলাভজনক সংস্থা চালু করেন। তাঁরা পরিবেশবান্ধব বাঁশের ব্যাগ তৈরি করে বিক্রি করতেন। সেই বিক্রির টাকা মেক্সিকো উপসাগরে তেলের খনি দুর্ঘটনার শিকার হওয়া মানুষদের সাহায্যের জন্য পাঠানো হতো। বড় বড় তারকারা এই ব্যাগ ব্যবহার করায় উদ্যোগটি সারা দেশে পরিচিতি পায়। এরপর তিনি ‘টেন্ডার হার্ট’ নামে একটি পোশাকের ব্যবসাও শুরু করেন। এই কাজগুলো প্রমাণ করেছিল যে, ব্যবসার মাধ্যমেও সমাজের ভালো করা সম্ভব। পড়াশোনা শেষ করে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এতিম শিশুদের জন্যও কাজ করেছিলেন।

কোন কোন ব্যবসার মাধ্যমে তাঁর আসল যাত্রা শুরু হয়েছিল?

‘হেল্প আস প্রজেক্ট’ ছিল ব্যবসায়ী হিসেবে হুইটনির প্রথম বড় সাফল্য। পরিবেশ ও মানুষের কল্যাণের সাথে ব্যবসাকে কীভাবে জুড়তে হয়, তা তিনি এখান থেকেই শেখেন। তিনি বোঝেন যে কীভাবে একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে হয় এবং মানুষের মন জয় করতে হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, ব্যবসার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই চিন্তাভাবনা থেকেই পরে তিনি ‘বাম্বল’ অ্যাপের নিয়মকানুনগুলো তৈরি করেছিলেন, যেখানে নারীদের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হুইটনি কীভাবে পড়াশোনা এবং সামাজিক কাজ থেকে প্রযুক্তির স্টার্টআপ (নতুন ব্যবসা) জগতে পা রাখলেন?

২০১১ সালে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে স্নাতক শেষ করার পর, হুইটনি লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যান। সেখানে তিনি ‘কার্ডিফাই’ (Cardify) নামের একটি ছোট স্টার্টআপে যোগ দেন। এটি ‘হ্যাচ ল্যাবস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে শন র্যাড (Sean Rad) নামের একজন উদ্যোক্তার পরিচালনায় চলত। কার্ডিফাই এমন একটি অ্যাপ তৈরি করছিল যেখানে ব্যবহারকারীরা আঙুল দিয়ে সোয়াইপ (স্ক্রিনে টেনে সরিয়ে দেওয়া) করে বিভিন্ন দোকানের লয়্যালটি কার্ড দেখতে পারতেন। কিন্তু এই প্রজেক্টটি যখন থমকে যায়, তখন সেই সোয়াইপ করার প্রযুক্তি এবং টিমের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা একটি নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ম্যাচবক্স’ (Matchbox)—যা ছিল একটি ডেটিং অ্যাপ। হুইটনি শন র্যাড এবং ক্রিস্টোফার গুলচিনস্কির সাথে এই অ্যাপ তৈরির শুরুর দিকের টিমে যোগ দেন।

সামাজিক কাজ এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির পড়াশোনা থেকে এই দ্রুতগতির প্রযুক্তি জগতে চলে আসাটা ছিল তাঁর জন্য খুব স্বাভাবিক একটি পরিবর্তন। কারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং সমাজের মানুষের মেলামেশার ধরন সম্পর্কে তাঁর যে ধারণা ছিল, তা এই নতুন প্রযুক্তির দুনিয়ায় গ্রাহক আকর্ষণে এবং অ্যাপের উন্নয়নে সরাসরি কাজে লেগেছিল।

টিন্ডার (Tinder) অ্যাপের মার্কেটিং ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হুইটনির বিশেষ অবদান কী ছিল?

‘ম্যাচবক্স’ নাম বদলে যখন অ্যাপটির নাম ‘টিন্ডার’ রাখা হয়, তখন মাত্র ২২ বছর বয়সী হুইটনিকে এর পাবলিক লঞ্চ বা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার আগেই মার্কেটিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। অ্যাপটির ‘টিন্ডার’ নামটি দেওয়ার মূল কৃতিত্ব হুইটনিকেই দেওয়া হয়। অ্যাপটির আগুনের শিখা (ফ্লেম) আকৃতির লোগো এবং দুটি মানুষের মাঝে প্রেমের আগুন জ্বালানোর ধারণা থেকে তিনি এই নামটি বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর মূল সাফল্য ছিল মার্কেটিং বা প্রচারণার কৌশলে। তিনি আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোকে টার্গেট করে বেশ জোরালো প্রচারণা চালান। সেখানে তিনি বিভিন্ন ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর (প্রতিনিধি) নিয়োগ করেন এবং তরুণদের পছন্দ অনুযায়ী বার্তা ছড়ান, যার ফলে টিন্ডার খুব দ্রুত তরুণ-তরুণীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তাঁর এই চেষ্টার ফলেই একটি ছোটখাটো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হুট করেই পুরো দেশের তরুণ সমাজের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তবে এই কাজের পাশাপাশি তাকে টিমের ভেতরের জটিল সম্পর্কগুলোও সামলাতে হয়েছিল, যার মধ্যে অন্য এক সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাস্টিন মতিনের (Justin Mateen) সাথে তাঁর প্রেমের সম্পর্কও ছিল। তাঁর অসাধারণ মার্কেটিং বুদ্ধির কারণে অনেক জায়গায় তাকে সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে পদবি এবং কৃতিত্ব নিয়ে টিমের ভেতর নানা ঝামেলা তৈরি হয়।

কোন পরিস্থিতির কারণে হুইটনি টিন্ডার ছেড়েছিলেন এবং এরপর যে মামলা হয়েছিল তার পেছনের ঘটনা কী?

২০১৪ সালের এপ্রিলে হুইটনি টিন্ডার থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি কোম্পানির এবং কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে যৌন বৈষম্য ও হেনস্থার অভিযোগ এনে মামলা করেন। পরবর্তীতে ১ মিলিয়ন (১০ লাখ) ডলারের বেশি অর্থের বিনিময়ে আদালতের বাইরে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে মামলাটির নিষ্পত্তি হয়। এই মামলায় বিবাদীদের মধ্যে তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক এবং টিন্ডারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাস্টিন মতিনও ছিলেন। হুইটনি এই সম্পর্কটিকে মানসিকভাবে নির্যাতনমূলক বলে বর্ণনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, পেশাদার পরিবেশেও তাকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনতে হয়েছিল, নানাভাবে অপমান করা হয়েছিল এবং একটি মিটিংয়ের সময় তাকে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় গালি দেওয়া হয়েছিল। অফিসের পরিবেশ এতটাই বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল যে, তাকে একরকম বাধ্য করা হয় চাকরি ছাড়তে এবং কিছু ক্ষেত্রে তাঁর সহ-প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতিও কেড়ে নেওয়া হয়।

এই মামলা এবং মিডিয়ার অতিরিক্ত নাড়াচাড়ার কারণে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোচনা হয়। যদিও তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক এই অভিযোগগুলোকে ‘হাস্যকর’ ও ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু এই পুরো ঘটনাটি হুইটনির মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তবে এই ব্যবস্থাপনাই তাঁর মনে একটি জেদ তৈরি করেছিল—তিনি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা একদম শুরু থেকেই নারীদের জন্য নিরাপদ হবে এবং যেখানে এমন নোংরা পরিবেশ থাকবে না। মামলার এই সমঝোতা তাঁকে নতুন করে শুরু করার মতো অর্থ এবং মানসিক শান্তি দুটোই দিয়েছিল।

টিন্ডার ছাড়ার পর হুইটনি কীভাবে ‘বাম্বল’ (Bumble) অ্যাপের আইডিয়া তৈরি এবং তা চালু করলেন?

টিন্ডার ছাড়ার পর, হুইটনি প্রথমে কেবল মেয়েদের জন্য ‘মার্সি’ (Merci) নামের একটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম (সোশ্যাল নেটওয়ার্ক) তৈরি করার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপ ‘বাডু’ (Badoo)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং রাশিয়ান বিলিয়নেয়ার আন্দ্রে আন্দ্রেভ (Andrey Andreev) তাকে ডেটিং অ্যাপ নিয়েই কাজ করার পরামর্শ দেন। তিনি হুইটনিকে তাঁর নতুন কোম্পানি ‘ম্যাজিকল্যাব’ (যা পরে বাম্বল ইনকর্পোরেট নামে পরিচিত হয়)-এ পার্টনার বা অংশীদার হিসেবে নেন। আন্দ্রেভ এই প্রজেক্টে ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) ডলার বিনিয়োগ করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সাহায্য দেন। এর বিনিময়ে কোম্পানির ৭৯% মালিকানা তিনি নিজের কাছে রাখেন এবং হুইটনি পান ২০% শেয়ার ও কোম্পানির সিইও (CEO) বা প্রধান কর্মকর্তার পদ।

অ্যাপটি তৈরি করার জন্য তিনি ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে টেক্সাসের অস্টিনে চলে যান। এর পেছনের মূল ভাবনাটি ছিল বেশ বৈপ্লবিক: ছেলে ও মেয়ের মধ্যকার ম্যাচ বা পছন্দের ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র মেয়েরাই প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম মেসেজ বা বার্তা পাঠাতে পারবে। এই নিয়মটি ডেটিং অ্যাপগুলোতে মেয়েদের মুখোমুখি হওয়া নানা ধরনের হেনস্থা ও আপত্তিকর মেসেজের সমস্যা সরাসরি সমাধান করেছিল। ডেটিংয়ের ক্ষেত্রে পুরোনো ও প্রথাগত রীতিনীতি বদলে দিয়ে আরও ভদ্র ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে ‘বাম্বল’ যাত্রা শুরু করে। প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ফ্রিতে বিভিন্ন জিনিস দেওয়া এবং মেয়েদের সঙ্ঘ বা ‘সোরোরিটি ভাইব’ তৈরি করার মাধ্যমে এর প্রচারণা চালানো হয়, যা খুব দ্রুত ব্যবহারকারীদের আকর্ষণ করে।

কোন নতুন ফিচার ও নীতিগুলো বাম্বল-কে অন্য অ্যাপ থেকে আলাদা করেছিল এবং এর সাফল্যের কারণ ছিল?

বাম্বল অ্যাপটি শুধু প্রযুক্তির স্বাধীনতার ওপর ছেড়ে না দিয়ে মানুষের ভালো আচরণের ওপর জোর দিয়েছিল। মেয়েদের প্রথম মেসেজ দেওয়ার নিয়মের পাশাপাশি অ্যাপটিতে আরও কিছু ফিচার যুক্ত করা হয়: যেমন রোমান্টিক সম্পর্কের জন্য ‘বাম্বল ডেট’ (Bumble Date), সাধারণ বন্ধুত্বের জন্য ‘বাম্বল বিএফএফ’ (Bumble BFF), এবং পেশাদার নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য ‘বাম্বল বিজ’ (Bumble Bizz)। এর মাধ্যমে এটি শুধু একটি ডেটিং অ্যাপ না হয়ে মানুষের একে অপরের সাথে যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে। হুইটনি প্রায়ই বলতেন, তাঁর লক্ষ্য হলো এমন একটি ফেসবুক তৈরি করা “যেখানে মানুষ একে অপরকে চেনার আগেই যোগাযোগ করতে পারবে।”

অ্যাপটিতে কড়া নিয়মকানুন ছিল। পরে এতে ছবি দিয়ে প্রোফাইল যাচাই করা, খারাপ ভাষা ও হেনস্থা রোখার জন্য এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা এবং অস্ত্রের মতো কিছু ছবির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ব্যবহারকারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই এই অ্যাপের মাধ্যমে ১৫ মিলিয়নেরও (১ কোটি ৫০ লাখ) বেশি চ্যাট এবং ৮০ মিলিয়নেরও বেশি ম্যাচ সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪২০ জনেরও বেশি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর নিয়োগ এবং মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অ্যাপটির মূল সেবাগুলো ফ্রি থাকলেও, প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন এবং প্রোফাইল বুস্ট করার মতো কিছু ফিচারের মাধ্যমে কোম্পানিটি আয় করতে শুরু করে।

দ্রুত বড় হওয়ার সময় বাম্বল-কে ভেতরে ও বাইরে কোন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হয়েছিল?

শুরুর দিকের একটি চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যবহারকারীদের মাঝে নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা এবং একই সাথে অফিসের তরুণ কর্মীদের সংস্কৃতিকে সামলানো। ২০১৯ সালে একটি বড় সংকট তৈরি হয় যখন ‘ফোর্বস’ (Forbes) ম্যাগাজিনের একটি তদন্তে প্রকাশ পায় যে, বাম্বলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাজিকল্যাব/বাডু’-এর প্রধান কার্যালয়ে নারীবিরোধী ও নোংরা পরিবেশ রয়েছে। এই ঘটনার পর ‘ব্ল্যাকস্টোন’ নামের একটি বড় প্রতিষ্ঠান বাম্বলের বেশিরভাগ শেয়ার কিনে নেয় এবং আগের পার্টনার আন্দ্রেভ কোম্পানি থেকে বিদায় নেন। তখন হুইটনিকে কোম্পানির পূর্ণ সিইও (CEO) করা হয়। সেই সময় কোম্পানির মূল্য ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলার এবং ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৭৫ মিলিয়ন (৭ কোটি ৫০ লাখ)।

এই পরিবর্তনের পর হুইটনি কোম্পানির সুনাম ফিরিয়ে আনা, কাজকর্মে পেশাদারিত্ব আনা এবং বাডু-কে বাম্বলের সাথে একীভূত করার ওপর জোর দেন। একদিকে ব্যবসার দ্রুত বৃদ্ধি ও আয় বাড়ানো, অন্যদিকে মেয়েদের নিরাপত্তার মূল লক্ষ্য ধরে রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাটা বেশ কঠিন ছিল, বিশেষ করে যখন টিন্ডার এবং হিঞ্জ (Hinge)-এর মতো অ্যাপগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা বাড়ছিল।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাম্বল-এর আইপিও (IPO) বা শেয়ার বাজারে আসা হুইটনি এবং কোম্পানির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

২০২১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বাম্বল শেয়ার বাজারে (IPO) প্রবেশ করে। প্রথম দিনেই এর শেয়ারের দাম অনেক বেড়ে যায় এবং কোম্পানির মূল্য প্রায় ৮ থেকে ১৪ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে মাত্র ৩১ বছর বয়সে হুইটনি ওল্ফ হার্ড বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ‘স্বনির্ভর’ (নিজের চেষ্টায় হওয়া) নারী বিলিয়নেয়ার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানিকে শেয়ার বাজারে নিয়ে আসা সবচেয়ে কম বয়সী নারী সিইও হন।

শেয়ার বাজারে কোম্পানির উদ্বোধনের দিন তিনি তাঁর ১৮ মাসের সন্তানকে কোলে নিয়ে নাসডাক (Nasdaq)-এর ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। এই ছবিটি কর্মক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থনের একটি দারুণ প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে তিনি মিডিয়ার ওপর কিছুটা বিরক্তও ছিলেন, কারণ মিডিয়া তাঁর তৈরি করা সুন্দর অ্যাপটির চেয়ে তাঁর পুরনো টিন্ডারের তিক্ত অতীত নিয়ে বেশি চর্চা করছিল। এই আইপিও বা শেয়ার বাজার থেকে পাওয়া অর্থ বাম্বলকে আরও বড় করতে সাহায্য করে এবং ব্যবসা জগতে হুইটনির নাম চিরদিনের জন্য লিখে দেয়।

শেয়ার বাজারে আসা, বিলিয়নেয়ার হওয়া এবং বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি হুইটনির নেতৃত্বে কী প্রভাব ফেলেছিল?

কোম্পানি পাবলিক বা শেয়ার বাজারে আসার পর প্রতি তিন মাসে লাভের হিসাব দেওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের চাপ সামলানোর মতো নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। প্রতিযোগিতার বাজারে নতুন গ্রাহক পাওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়া এবং নতুন প্রজন্মের (Gen Z) চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের কারণে কোম্পানির শেয়ারের দামে বেশ ওঠানামা দেখা দেয়।

টানা প্রায় ১০ বছর কঠোর পরিশ্রমের পর, ২০২৩ সালের নভেম্বরে হুইটনি ঘোষণা করেন যে তিনি সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন এবং কোম্পানির ‘এক্সিকিউটিভ চেয়ার’ বা প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন। তাঁর জায়গায় স্ল্যাক (Slack)-এর প্রাক্তন সিইও লিডিয়ান জোন্স নতুন সিইও হন। তবে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে লিডিয়ান ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করলে হুইটনি আবারও সিইও হিসেবে ফিরে আসেন।

এই বিরতির সময়ে হুইটনি নিজেকে এবং পরিবারকে সময় দেন। তিনি তাঁর দুই সন্তান এবং স্বামী মাইকেল হার্ডের সাথে কাটানো সময় থেকে নতুন শক্তি পান। তিনি বুঝতে পারেন যে বাম্বলের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘ভালোবাসা’ (Love) এবং তিনি কোম্পানিটিকে একটি ‘ভালোবাসার ঘর’ হিসেবে গড়ে তোলার নতুন সংকল্প নিয়ে ফিরে আসেন।

হুইটনির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন তাঁর মূল্যবোধ সম্পর্কে কী জানায়?

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে একটি স্কি ট্রিপে হুইটনির সাথে মাইকেল হার্ডের পরিচয় হয়, যিনি একটি তেল ও গ্যাস ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। ২০১৭ সালে ইতালিতে তাঁদের চমৎকার বিয়ে হয়। বর্তমানে তাঁরা টেক্সাসের অস্টিনে বসবাস করছেন। বড় ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি একজন মা হিসেবে তাঁর সন্তানদের সময় দেওয়াকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০২৪ সালে তাঁর সিইও পদ থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার মূল কারণও ছিল সন্তানদের পাশে থাকা। ২০২৫ সালে যখন তিনি ফিরে আসেন, তখন তাঁর মধ্যে জীবনের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছিল—যেখানে কাজের পাশাপাশি মানসিক শান্তি ও সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি।

বাম্বল-এর বাইরে হুইটনি সমাজসেবা ও আইনের ক্ষেত্রে কী অবদান রেখেছেন?

২০১৯ সালের মার্চ মাসে হুইটনি টেক্সাসের আদালতে ডেটিং অ্যাপে মেয়েদের আপত্তিকর ছবি পাঠিয়ে হেনস্থা করার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর আইন করার দাবি জানান। ২০২০ সালে তিনি ‘হার্ড ফ্যামিলি অফিস’ গঠন করেন, যার মাধ্যমে তিনি নতুন নতুন ছোট ব্যবসায় সাহায্য করেন এবং সমাজসেবামূলক কাজ পরিচালনা করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন শিক্ষা ও বিনোদনমূলক প্রতিষ্ঠানের বোর্ডের সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন। ২০২৫ সালে তাঁর জীবনকাহিনি নিয়ে ‘সোয়াইপড’ (Swiped) নামের একটি সিনেমাও তৈরি হয়, যা তাঁর সংগ্রাম ও সফলতার গল্প তুলে ধরে।

২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে হুইটনির নেতৃত্বে বাম্বল কোন নতুন চ্যালেঞ্জ ও কৌশলের মুখোমুখি হচ্ছে?

২০২৬ সালের বর্তমান বাজারে বাম্বল বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যেমন—আয় কমে যাওয়া এবং তরুণ প্রজন্মের (Gen Z) প্রথাগত ডেটিং অ্যাপের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য হুইটনি প্রযুক্তিতে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর মাধ্যমে আরও নিখুঁত ম্যাচিং এবং ২০২৬ সালের মধ্যে অ্যাপটিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন, যাতে সোয়াইপ করার পুরনো ক্লান্তি দূর করা যায়। তিনি এখন আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের লক্ষ্য পূরণে অবিচল।

হুইটনি ওল্ফ হার্ডের পুরো জীবন থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই?

হুইটনি ওল্ফ হার্ডের জীবন আমাদের শেখায় যে—ব্যক্তিগত কষ্ট, কর্মক্ষেত্রের প্রতারণা এবং সমাজের সমালোচনাকেও কীভাবে সফলতায় রূপ দেওয়া যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে একজন নারী উদ্যোক্তাও কোটি কোটি ডলারের প্রযুক্তির কোম্পানি তৈরি ও পরিচালনা করতে পারেন। তাঁর ‘মেয়েরা প্রথম মেসেজ দেবে’—এই একটি আইডিয়া পুরো ডেটিং ইন্ডাস্ট্রির নিয়ম বদলে দিয়েছে।

তাঁর এই যাত্রা আরও শেখায় যে, অনেক বড় অর্জনের মাঝেও মানুষের নিজের জন্য বিরতি নেওয়া এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানো কতটা জরুরি। তিনি কেবল একজন তরুণ বিলিয়নেয়ার নন, বরং এমন একজন নেতা যিনি বিশ্বাস করেন যে প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে আরও সুন্দর, নিরাপদ এবং মানুষের সম্পর্কের জন্য আরও উপযোগী করে তোলা সম্ভব। ব্যথাকে শক্তিতে এবং স্বপ্নকে সাফল্যে রূপ দেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ হুইটনি ওল্ফ হার্ড।

১. তথ্যের উৎস ও নির্ভুলতা: এই ব্লগে প্রকাশিত সমস্ত তথ্য ও কনটেন্ট ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন উন্মুক্ত উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা তথ্যের সঠিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি; তা সত্ত্বেও কোনো কোনো তথ্য আংশিক বা সম্পূর্ণ ভুল, পুরোনো অথবা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।

২. কোনো গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা নয়: এই ওয়েবসাইটের কোনো তথ্যকেই শতভাগ সঠিক বা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না। এই ব্লগের কনটেন্ট বা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পাঠককে নিজ দায়িত্বে তা যাচাই করে নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে। তথ্যের কোনো প্রকার ভুলের জন্য এই ব্লগ কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায়ী থাকবে না।

৩. কোনো পেশাদার পরামর্শ নয়: এখানে শেয়ার করা মতামত বা তথ্যগুলো কেবল সাধারণ জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি কোনো প্রকার আইনি, চিকিৎসাবিষয়ক, আর্থিক বা পেশাদার পরামর্শ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

৪. কপিরাইট বা স্বত্বাধিকার: আমরা ইন্টারনেটের বিভিন্ন ফ্রি ও পাবলিক সোর্স থেকে কনটেন্ট আইডিয়া বা তথ্য সংগ্রহ করি। যদি আমাদের কোনো পোস্ট বা ছবিতে আপনার কপিরাইট করা উপাদান থাকে এবং আপনি তা সরিয়ে নিতে চান, তবে উপযুক্ত প্রমাণসহ আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।

Leave a Comment