সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিতি: মাইকেল ড্রেটন (১৫৬৩-১৬৩১) ছিলেন উইলিয়াম শেকসপিয়রের সমসাময়িক। তিনি তাঁর দীর্ঘ ভৌগোলিক-ঐতিহাসিক কবিতা Poly-Olbion এবং সনেট গুচ্ছ Idea-এর জন্য ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর কবিতায় একাধারে যেমন তীব্র আবেগ ও প্রেম রয়েছে, তেমনই রয়েছে ইতিহাস ও প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা।
১. যেহেতু আর কোনো আশা নেই (Since there’s no help, come let us kiss and part)
এটি মাইকেল ড্রেটনের সবচেয়ে বিখ্যাত সনেট (Sonnet 61)। এখানে প্রেম শেষ হয়ে যাওয়ার মুহূর্তের এক চরম মানসিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
যেহেতু আর কোনো পথ নেই, এসো আমরা চুম্বন করি আর বিদায় নেই—
না, এখন আমি পুরোপুরি মুক্ত, তুমিও মুক্ত নিজের মতো;
আমাদের সমস্ত চুক্তি আজ এখানেই শেষ হয়ে যাক,
আর যখনই দেখা হবে, চিনব না একে অপরকে কোনোভাবে।
খেলার ছলে আমাদের ভালোবাসার শেষ নিঃশ্বাসটুকু স্তব্ধ হয়ে আসছে,
অনুভূতির নাড়ি আজ মন্থর, আবেগ আজ প্রায় মৃত;
বিশ্বাসের দেবী আজ শয্যাশায়ী, চোখ দুটো তার বন্ধ,
আর নিষ্কলঙ্ক নির্দোষিতা তার মৃত্যুর অপেক্ষায় নত।
কিন্তু ঠিক এই শেষ মুহূর্তে, যখন সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছে,
যখন জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার ঠিক আগের ক্ষণ—
তুমি চাইলে, তোমার ওই এক সামান্য মায়াবী ছোঁয়ায়,
পুনর্জীবন পেতে পারে আমাদের এই মৃতপ্রায় প্রেম-মন।
২. আমার হৃদয়ের মায়াবী আয়না (To Idea: Sonnet 1)
এই সনেটে কবি তাঁর প্রিয়তমাকে নিজের কাব্যের একমাত্র অনুপ্রেরণা এবং হৃদয়ের মায়াবী রূপক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
আমার এই কাব্যের চরণে কোনো ধার করা শব্দ নেই,
নেই কোনো অন্য কবির অন্ধ অনুকরণের প্রয়াস;
আমার হৃদয় যা অনুভব করে, লেখনী শুধু তাই বলে,
যেখানে কেবল তোমারই রূপের নিত্য বসবাস।
লোকে বলে আমি নাকি কল্পনার জগতে ভাসি,
কিন্তু তারা জানে না, তুমিই আমার একমাত্র সত্য;
আমার এই ক্ষুদ্র সনেটের প্রতিটি লাইনে আর ছন্দে,
বন্দি হয়ে আছে আমার ভালোবাসার আকুল ধন্দ।
পৃথিবী বদলে যাবে, মুছে যাবে কত শত নাম,
কিন্তু আমার এই শব্দে তুমি অমর হয়ে রবে;
আমার ভালোবাসা যতবার পাঠ করবে এই ধরণী,
ততবার তুমি নতুন করে জীবিত হবে এই ভবে।
৩. কালের করাল গ্রাস (To Time)
সময় কীভাবে মানুষের যৌবন ও সৌন্দর্য কেড়ে নেয়, কিন্তু সত্যিকারের প্রেমকে স্পর্শ করতে পারে না—তা নিয়ে এই কবিতা।
ওহে নিষ্ঠুর কাল, তুমি যতই চালাও তোমার রথ,
কেড়ে নাও পৃথিবীর যত সুন্দর আর অমূল্য রতন;
জানি একদিন তুমি মলিন করবে তার চোখের জ্যোতি,
কুঁকড়ে দেবে সেই ত্বক, যা আজ বড় প্রিয় আপন।
কিন্তু মনে রেখো সময়, তোমার এই ধারালো কাস্তে,
কেটে ফেলতে পারে কেবল নশ্বর দেহের এই বাঁধন;
আমার অন্তরে যে প্রেমের বীজ বুনেছে সে রূপসী,
তাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা নেই তোমার কোনো ক্ষণ।
তুমি দিনকে রাত করতে পারো, বছর করতে পারো পার,
সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ করতে পারো এক পলকের ঘাতে;
কিন্তু আমাদের এই পবিত্র আত্মার যে মিলন,
তা অক্ষয় হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকালের সাথে।
৪. এজিনকোর্টের যুদ্ধগীত (The Ballad of Agincourt)
ড্রেটনের একটি বিখ্যাত দেশাত্মবোধক ও ঐতিহাসিক কবিতা, যেখানে ১৪১৫ সালের ইংরেজ সেনাবাহিনীর বীরত্ব গাঁথা বর্ণিত হয়েছে।
ফেয়ার ইশল ব্যানার ওড়াও, বাতাস আজ উত্তাল,
রাজা হেনরির আদেশে বীরেরা সব মার্চ করে চলে;
ফরাসিদের বিশাল সেনাদল দাঁড়িয়ে ওপারে গর্বে,
কিন্তু ইংরেজদের বুকে আজ বিজয়ের আগুন জ্বলে।
ধনুকে টান দাও তীরন্দাজ, আকাশ ঢেকে যাক তীরের মেঘে,
তরবারি ঝলসে উঠুক সূর্যের তীব্র আলোয়;
আজ পিছু হটার কোনো পথ নেই হে সহযোদ্ধা,
জয়ী হয়ে ফিরব, নয়তো প্রাণ দেব এই ধুলোয়।
ধন্য সেই দিন, ধন্য সেই এজিনকোর্টের মাঠ,
যেখানে অল্প কজন বীর ইতিহাস লিখেছিল রক্তে;
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ মনে রাখবে এই নাম,
কীভাবে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা যায় বীরত্বের শক্তিতে।
৫. নদীর গান (To the River Ankor)
নিজের জন্মভূমির নদী অ্যানকরের প্রতি কবির ভালোবাসা এবং কীভাবে সেই নদী তাঁর সমস্ত দুঃখের সাক্ষী, তা নিয়ে এই সনেট।
ওহে আমার চেনা নদী, তোমার এই শান্ত জলধারা,
কত শত স্মৃতি নিয়ে বয়ে চলেছ প্রতিনিদিন;
তোমার তীরে বসেই আমি প্রথম কবিতা লিখতে শিখেছি,
তোমার কলতানেই জুড়িয়েছি এই হৃদয় ক্লান্ত-ক্ষীণ।
আমার যত অশ্রু, তা মিশে গেছে তোমার তরঙ্গে,
আমার যত গোপন দীর্ঘশ্বাস, তা বয়ে নিয়ে গেছে তোমার হাওয়া;
যখন আমার প্রিয়তমা আমার প্রেম ফিরিয়ে দিয়েছিল,
তখন শুধু তোমার বুকেই পেয়েছিলাম একটু আশ্রয় পাওয়া।
অন্য কবিরা হয়তো টেমস বা দানিয়ুবের গান গায়,
তাদের বিশালতা নিয়ে কত সহস্র পঙক্তি লেখে;
কিন্তু আমার কাছে হে অ্যানকর, তোমার এই ছোট বাঁক,
পৃথিবীর সব নদীর চেয়ে বেশি মায়া দিয়ে রেখেছে ঢেকে।
৬. হৃদয়ের চোর (Sonnet 2: To Soul)
প্রিয়তমা কীভাবে কবির মন এবং আত্মা চুরি করেছে, তা নিয়ে একটি মিষ্টি ও রূপকধর্মী কবিতা।
চোর! চোর! বলে চিৎকার করতে ইচ্ছে করে আমার,
যে আমার মনের অন্ধকার রাতে সিঁধ কেটেছে গোপনে;
আমার সমস্ত শান্তি, আমার সব মধুর স্বপ্নগুলো,
লুটে নিয়ে গেছে সে চোখের পলকে, অতি সাবধানে।
কিন্তু কার কাছে বিচার চাইব আমি এই অপরাধের?
যখন প্রেমের আদালতেই সে নিজেই আজ বিচারক;
তার চোখের একটা চাউনিতেই তো আমি বন্দি,
তার হাসির কাছে হার মেনেছে আমার সব তর্ক।
হে সুন্দর চোর, তুমি যা নিয়েছ তা তোমারই থাক,
বদলে শুধু তোমার হৃদয়ের একটা কোণ আমায় দিও;
এই চুরির বদলে যদি একটু ভালোবাসা মেলাতে পারি,
তবে এই বন্দিদশাই হবে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
৭. রূপের মোহ (Sonnet 22)
বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে ভেতরের পবিত্রতা যে বেশি স্থায়ী, ড্রেটন এই কবিতায় সেই দর্শন প্রকাশ করেছেন।
আমি শুধু তোমার এই রেশমি চুলের ভক্ত নই,
নই শুধু ওই হরিণ চোখের মায়াবী আলোর দাস;
জানি একদিন এই ফর্সা গাল মলিন হয়ে যাবে,
বার্ধক্যের ছায়ায় ঢাকা পড়বে এই চপল প্রকাশ।
আমি ভালোবেসেছি তোমার ভেতরের সেই দেবীকে,
যার দয়া আর সততা আমায় মুগ্ধ করে ক্ষণে ক্ষণে;
যে রূপ কখনো সময়ের নিয়মে হারিয়ে যায় না,
যা চিরকাল আলো ছড়ায় এক পবিত্র মনে।
তাই পৃথিবী যদি কখনো তোমার বাহ্যিক রূপ ভুলে যায়,
ভেবো না তুমি একা, বা ফুরিয়ে গেছে সব আলো;
আমার এই চোখ দিয়ে আমি দেখব তোমার সেই আত্মা,
যাকে আমি প্রথম দিন থেকেই বেসেছি এত ভালো।
৮. ডাফনিলের রাখালি গান (Daffodil)
একটি গ্রামীণ বা রাখালি (Pastoral) কবিতা, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং বসন্তের আগমনকে উদযাপন করা হয়েছে।
দেখো কেমন সবুজ ঘাসের চাদর বিছিয়েছে মাঠ,
ড্যাফোডিল ফুলেরা মাথা নাড়িয়ে হাসছে বাতাসে;
রাখাল তার বাঁশিতে তুলছে মধুর এক সুর,
বসন্ত এসেছে আজ প্রকৃতির প্রতিটি কোণে আর ঘাসে।
কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্য আজ সোনা ঢালছে,
পাখিরা গাইছে গান গাছের ডালে ডালে বসে;
এসো আমরা সব দুঃখ আর ক্লান্তি ভুলে যাই,
মেতে উঠি এই প্রকৃতির অকৃত্রিম আনন্দের রসে।
এই তো জীবন, যেখানে নেই কোনো শহরের কোলাহল,
নেই কোনো ক্ষমতার লোভ বা মিথ্যে অহংকার;
একমুঠো রোদ আর এক বুক খোলা বাতাস হলে,
মানুষের মন পেতে পারে পরম শান্তি আর এক নতুন পার।
৯. সাতটি তারা ও আমার ভাগ্য (Sonnet 43)
জ্যোতিষশাস্ত্র এবং আকাশের তারার রূপকে নিজের ভাগ্যের অনিশ্চয়তা ও প্রেমের কষ্টকে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি।
আকাশের ওই সাতটি তারা আজ আমার দিকে চেয়ে,
যেন লিখছে আমার ভাগ্যের কোনো এক গোপন লিপি;
তারা বলছে আমার প্রেমে শুধু আছে বিরহের জ্বালা,
পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার বেদনাই নাকি বেশি খাঁটি।
হে নক্ষত্র দল, তোমরা যতই করো আমার ভাগ্য নির্ধারণ,
যতই দেখাও কষ্টের কালো মেঘ আমার এই আকাশে;
আমি আমার বিশ্বাসের পথ থেকে এক চুলও নড়ব না,
যার জন্য এই জীবন, তার বুকেই মরব শেষ নিশ্বাসে।
ভাগ্য যদি আমায় তার থেকে দূরেও সরিয়ে রাখে,
আমার মন তো রয়ে যাবে তারই চরণের ধুলোয়;
তারার আলো নিভে যেতে পারে কোনো এক কালবৈশাখীতে,
কিন্তু আমার এই ভালোবাসা কখনো হারাবে না কোনো কূলের থৈ-এ।
১০. শেষ সনেট: অমরত্ব (Sonnet 63)
এই কবিতায় ড্রেটন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, মানুষের জীবন নশ্বর হলেও কবিতার মাধ্যমে প্রেম চিরকাল বেঁচে থাকে।
একদিন এই শরীর ধুলোয় মিশে যাবে সত্যি,
আমার এই হাত যা আজ লিখছে, তাও হবে অসাড়;
এই পৃথিবী হয়তো ভুলে যাবে আমি কে ছিলাম,
বন্ধ হয়ে যাবে আমার এই জীবনের সব কপাট ও দুয়ার।
কিন্তু আমার এই ভাঙা কলমে যে সুর আমি রেখে গেলাম,
যে শব্দগুলো সাজালাম তোমার প্রেমের চাদরে;
তা কোনোদিন মরবে না, কোনোদিন হবে না মলিন,
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একে বুকে তুলে নেবে পরম আদরে।
যতক্ষণ মানুষ শ্বাস নেবে, যতক্ষণ থাকবে ভাষা,
ততক্ষণ আমাদের এই প্রেমের গল্প পাঠ করবে সবাই;
আমরা মরেও বেঁচে থাকব এই কবিতার পাতায় পাতায়,
সময়ের বুকে আমাদের এই ভালোবাসার কোনো বিনাশ নাই।
মাইকেল ড্রেটন (১৫৬৩–১৬৩১): জীবন, সাহিত্য ও এলিজাবেথান যুগের মহাকাব্যিক কণ্ঠস্বর
ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে এলিজাবেথান (Elizabethan) এবং জ্যাকোবিয়ান (Jacobean) যুগের সন্ধিক্ষণের অন্যতম প্রবাল ও বহুমুখী কবি হলেন মাইকেল ড্রেটন (Michael Drayton)। উইলিয়াম শেকসপিয়র, এডমন্ড স্পেন্সার, এবং বেন জনসনের সমসাময়িক এই কবি তাঁর দীর্ঘ ঐতিহাসিক কবিতা, দেশপ্রেমমূলক গীতি-কবিতা এবং অসাধারণ সনেট গুচ্ছের জন্য বিখ্যাত। তৎকালীন ইংল্যান্ডের জাতীয় চেতনা, ইতিহাস এবং ভূখণ্ডকে যেভাবে তিনি কাব্যের রূপ দিয়েছেন, তা ইংরেজি সাহিত্যে বিরল। নিচে তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম ও সাহিত্যিক অবদানের একটি অত্যন্ত বিস্তারিত ও তথ্যসমৃদ্ধ জীবনী তুলে ধরা হলো।
১. প্রারম্ভিক জীবন ও শৈশব (১৫৬৩–১৫৮০)
জন্ম ও বংশপরিচয়
মাইকেল ড্রেটন ১৫৬৩ সালে ইংল্যান্ডের ওয়ারউইকশায়ারের (Warwickshire) হার্টশিল (Hartshill) নামক একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, তবে ধারণা করা হয় তাঁর বাবা ড্রেটন পরিবারের একজন সাধারণ ব্যবসায়ী বা মাঝারি সচ্ছল ব্যক্তি ছিলেন। ওয়ারউইকশায়ার অঞ্চলটি প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল, যা পরবর্তীতে ড্রেটনের প্রকৃতি-ভিত্তিক কবিতায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শিক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতা
ড্রেটনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রির (যেমন অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ) প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে তিনি তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী এক অভিজাত পরিবারে ‘পেজ’ (Page) বা তরুণ সেবক হিসেবে যোগ দেন।
- তিনি পোলসওয়ার্থের (Polesworth) স্যার হেনরি গুডইয়ারের (Sir Henry Goodere) পরিবারে আশ্রয় ও শিক্ষা লাভ করেন।
- এখানেই তিনি ধ্রুপদী সাহিত্য, ইতিহাস এবং কাব্যের সাথে পরিচিত হন। স্যার হেনরি গুডইয়ার কেবল তাঁর পৃষ্ঠপোষকই ছিলেন না, বরং ড্রেটনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মূল ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন।
২. সাহিত্য জীবনের সূচনা ও ‘আইডিয়া’র অনুপ্রেরণা
১৫৯০-এর দশকের শুরুতে ড্রেটন লন্ডনে চলে আসেন এবং নিজেকে পূর্ণাঙ্গ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর প্রাথমিক কাজগুলোতে রেনেসাঁ যুগের ধর্মীয় ও রাখালি (Pastoral) প্রভাব স্পষ্ট ছিল।
প্রথম প্রকাশ ও ধর্মীয় কাব্য
১৫৯১ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য হারমনি অব দ্য চার্চ’ (The Harmony of the Church) প্রকাশিত হয়। এটি ছিল ওল্ড টেস্টামেন্টের আধ্যাত্মিক গানগুলোর একটি কাব্যিক রূপান্তর। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এটি তৎকালীন আর্চবিশপের কোপানলে পড়ে এবং এর প্রায় সব কপি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
রাখালি কবিতা ও সনেট যুগ
১৫৯৩ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘আইডিয়াজ মিরর’ (Idea’s Mirror)। এটি ছিল ৫১টি সনেটের একটি সংকলন। এই ‘আইডিয়া’ (Idea) আসলে কে ছিলেন, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে, তিনি ছিলেন তাঁর পৃষ্ঠপোষক স্যার হেনরি গুডইয়ারের কন্যা অ্যান গুডইয়ার (Anne Goodere)।
অ্যান গুডইয়ারের প্রতি ড্রেটনের এই ভালোবাসা ছিল মূলত প্লেটোনিক বা আত্মিক। অ্যানের বিয়ের পরও ড্রেটন আজীবন অবিবাহিত ছিলেন এবং এই ‘আইডিয়া’কে কেন্দ্র করেই তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা রোমান্টিক সনেটগুলো (যেমন: Since there’s no help, come let us kiss and part) রচনা করেন।
৩. ঐতিহাসিক কাব্য এবং নাট্যচর্চা (১৫৯৬–১৬০৩)
এলিজাবেথান যুগের শেষভাগে ইংল্যান্ডে জাতীয়তাবাদের জোয়ার আসে। স্প্যানিশ আর্মাডাকে পরাজিত করার পর ইংরেজদের মধ্যে নিজেদের ইতিহাস জানার আগ্রহ তীব্র হয়। ড্রেটন এই সুযোগটিকে কাজে লাগান এবং ইতিহাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ঐতিহাসিক কবিতা
- Mortimeriados (১৫৯৬): এটি পরবর্তীতে ‘দ্য ব্যারনস ওয়ারস’ (The Barons’ Wars) নামে পুনর্লিখিত হয়। রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের রাজত্বকালের গৃহযুদ্ধ এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতন এতে চিত্রিত হয়েছে।
- England’s Heroical Epistles (১৫৯৭): এটি ওভিডের ‘হেরোইডেস’-এর আদলে লেখা। ইংল্যান্ডের ইতিহাসের বিখ্যাত প্রেমিক-প্রেমিকাদের (যেমন হেমিংটন ও জেন শোর) মধ্যকার কাল্পনিক চিঠিপত্র নিয়ে এই কাব্য গড়ে উঠেছে। এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।
থিয়েটার ও নাটক
১৫৯৭ থেকে ১৬০২ সালের মধ্যে ড্রেটন থিয়েটার ম্যানেজার ফিলিপ হেনসলোর (Philip Henslowe) জন্য নাটক লেখা শুরু করেন। তিনি একা নন, বরং থমাস ডেকার (Thomas Dekker) এবং অ্যান্টনি মান্ডের (Anthony Munday) মতো নাট্যকারদের সাথে যৌথভাবে প্রায় ২৩টি নাটক লিখেছিলেন। তবে তাঁর লেখা একক কোনো নাটক আজ টিকে নেই। কেবল ‘স্যার জন ওল্ডক্যাসেল’ (Sir John Oldcastle) নাটকের প্রথম খণ্ডটি টিকে আছে, যা শেকসপিয়রের ‘ফালস্টাফ’ চরিত্রের কাউন্টার-অ্যাক্ট হিসেবে লেখা হয়েছিল।
৪. জ্যাকোবিয়ান যুগ এবং ‘পলি-অলবিয়ন’ (১৬০৩–১৬২২)
১৬০৩ সালে রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর প্রথম জেমস (James I) ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। ড্রেটন নতুন রাজাকে স্বাগত জানিয়ে কবিতা লিখলেও রাজার সুনজরে আসতে ব্যর্থ হন। রাজদরবারের কোনো স্থায়ী পদ না পেয়ে ড্রেটন কিছুটা হতাশ হন এবং নিজেকে এক বিশাল ও মহৎ কর্মে নিয়োজিত করেন।
পলি-অলবিয়ন (Poly-Olbion)
এটি মাইকেল ড্রেটনের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং প্রধানতম সৃষ্টি। এটি মূলত ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের একটি বিশাল ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পদাঙ্ক-মহাকাব্য (Chorographical Poem)।
- প্রকাশকাল: এর প্রথম খণ্ড ১৬১২ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৬২২ সালে প্রকাশিত হয়। মোট ৩০টি ‘গান’ (Songs) বা অধ্যায়ে এটি বিভক্ত, যা প্রায় ১৫,০০০ লাইনের দীর্ঘ কবিতা।
- বিষয়বস্তু: কবি কাল্পনিকভাবে ইংল্যান্ডের প্রতিটি কাউন্টি, নদী, পাহাড়, অরণ্য ভ্রমণ করেছেন এবং সেই অঞ্চলের লোকগাথা, ইতিহাস, রাজাদের গল্প এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। এটি শুধু কবিতা নয়, বরং তৎকালীন ব্রিটেনের একটি সম্পূর্ণ মানচিত্র ও দলিল।
৫. শেষ জীবন ও অন্যান্য বিখ্যাত সৃষ্টি (১৬২২–১৬৩১)
জীবনের শেষ দশকেও ড্রেটনের লেখনী স্তব্ধ হয়নি। এই সময়ে তিনি কিছু বৈচিত্র্যময় ও হালকা মেজাজের চমৎকার কবিতা উপহার দেন।
বিখ্যাত কিছু পরবর্তী সৃষ্টি
- The Ballad of Agincourt (১৬০৬/১৬২৭): ১৪১৫ সালের এজিনকোর্টের যুদ্ধে ফরাসিদের বিরুদ্ধে ইংরেজদের ঐতিহাসিক বিজয়কে কেন্দ্র করে লেখা এই যুদ্ধগীতটি ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম সেরা বীরত্বগাথা।
- Nimphidia, the Court of Faery (১৬২৭): এটি একটি চমৎকার উপকথা বা মক-হিরোইক (Mock-heroic) কবিতা। পরিদের রাজা ওবেরন (Oberon) এবং রানি মাবের (Mab) গল্প নিয়ে এটি অত্যন্ত রসাত্মকভাবে রচিত।
৬. সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য ও শৈলী
মাইকেল ড্রেটন কোনো নির্দিষ্ট একটি ধারায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাব্যশৈলীর প্রধান দিকগুলো হলো:
| কাব্য ধারা | প্রধান বৈশিষ্ট্য | উল্লেখযোগ্য উদাহরণ |
| সনেট (Sonnet) | তীব্র আবেগ, রেনেসাঁ যুগের প্লেটোনিক প্রেম ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব। | Idea’s Mirror (Sonnet 61) |
| ঐতিহাসিক (Historical) | দেশপ্রেম, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নিখুঁত ইতিহাস চেতনা। | The Barons’ Wars, Agincourt |
| ভৌগোলিক (Chorographical) | প্রকৃতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ, নদী ও পাহাড়ের মানবীকরণ। | Poly-Olbion |
তিনি মূলত হিরোইক কাপলেট (Heroic Couplet) বা অন্ত্যমিলযুক্ত দ্বিপদী ছন্দে লিখতে ভালোবাসতেন, যা পরবর্তীতে আলেকজান্ডার পোপ এবং জন ড্রাইডেনের যুগে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
৭. মৃত্যু ও উত্তরাধিকার (১৬৩১)
১৬৩১ সালের ২৩ ডিসেম্বর লন্ডনে এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না, কিন্তু কবি হিসেবে তাঁর সম্মান ছিল আকাশচুম্বী।
লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে (Westminster Abbey)-র ‘পোয়েটস কর্নার’-এ (Poets’ Corner) তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিস্তম্ভে তাঁর বন্ধু তথা বিখ্যাত নাট্যকার বেন জনসনের লেখা একটি প্রশংসামূলক এপিটাফ বা স্মৃতিবাণী খোদাই করা আছে।
মাইকেল ড্রেটন এমন একজন কবি ছিলেন যিনি এলিজাবেথান যুগের রোমান্টিকতা এবং জ্যাকোবিয়ান যুগের বাস্তবতাবাদের সেতু হিসেবে কাজ করেছিলেন। শেকসপিয়রের মতো নাটকীয় খ্যাতি না পেলেও, খাঁটি ইংরেজি ঐতিহ্য ও ভূখণ্ডকে কাব্যের সুতোয় বাঁধার কারিগর হিসেবে তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।