জন মিল্টন (১৬০৮-১৬৭৪) হলেন ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তাঁর চমৎকার অমিত্রাক্ষর ছন্দের মহাকাব্য Paradise Lost (১৬৬৭)-এর জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যা তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ অবস্থায় মুখে বলে বলে লিখিয়েছিলেন। মিল্টন ইংরেজি কবিতাকে এক অভূতপূর্ব মহিমান্বিত রূপ, গভীর পাণ্ডিত্য এবং নৈতিক তীব্রতায় উন্নীত করেছিলেন। তিনি অসাধারণ কিছু ছোট কবিতা—ওড, এলিজি, সঙ্গী-কবিতা এবং সনেটও লিখেছিলেন—যা তাঁর ধ্রুপদী জ্ঞান, সুরের কান এবং গভীর ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বরকে ফুটিয়ে তোলে।
১. অন দ্য মর্নিং অব ক্রাইস্টস নেটিভিটি (১৬২৯)
খ্রিস্টের মানব রূপ ধারণের ঘটনাকে উদযাপন করে মিল্টনের এক উচ্চাভিলাষী প্রাথমিক ওড। এটি ধ্রুপদী আঙ্গিকের সাথে খ্রিস্টীয় বিস্ময়ের এক মেলবন্ধন।
এই তো সেই মাস, আর এই তো সেই আনন্দের ভোর,
যেখানে স্বর্গের চিরন্তন রাজার পুত্র,
বিবাহিত কুমারী তথা কুমারী মাতার কোলে জন্ম নিয়ে,
আমাদের মহান মুক্তির বার্তা উপর থেকে নিয়ে এসেছিলেন;
কারণ পবিত্র সাধকেরা একদা এমন গানই গেয়েছিলেন,
যে তিনি আমাদের মারাত্মক পাপের দায় থেকে মুক্ত করবেন,
এবং তাঁর পিতার সাথে আমাদের এক চিরস্থায়ী শান্তি স্থাপন করবেন।
সেই মহিমান্বিত রূপ, সেই অসহনীয় জ্যোতি,
আর রাজকীয় মহিমার সেই সুদূরপ্রসারী দীপ্তি,
যার সাথে তিনি স্বর্গের উচ্চ পরিষদ-সভায় বসতেন,
ত্রিমূর্তির একত্বের মাঝে আসন নিতেন,
তা তিনি পাশে সরিয়ে রাখলেন এবং আমাদের সাথে থাকার জন্য,
অনন্ত দিনের সেই রাজপ্রাসাদ পরিত্যাগ করলেন,
আর আমাদের সাথে নশ্বর মাটির এক অন্ধকার ঘর বেছে নিলেন।
… [মূল কবিতাটি এর বিখ্যাত “স্তবগান” অংশের সাথে এগিয়ে যায় যেখানে যিশুর জন্মের রাতের শান্তি, পৌত্তলিক দেবতাদের পলায়ন এবং মুক্তির প্রতিশ্রুতির বর্ণনা রয়েছে। এটি মিল্টনের প্রাথমিক জীবনের অন্যতম সেরা সৃষ্টি।]
২. অন শেকসপিয়র (১৬৩০)
মিল্টন যখন মাত্র ২১ বছরের যুবক, তখন শেকসপিয়রের প্রতি সম্মান জানিয়ে লেখা একটি সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী শ্রদ্ধাঞ্জলি।
স্তূপীকৃত পাথরের মাঝে এক যুগের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে,
আমার শেকসপিয়রের সম্মানিত অস্থির কি কোনো প্রয়োজন আছে?
কিংবা তাঁর পবিত্র স্মৃতিচিহ্নগুলো কি লুকিয়ে রাখা উচিত
তারকা-স্পর্শী কোনো পিরামিডের নিচে?
স্মৃতির প্রিয় পুত্র, খ্যাতির মহান উত্তরাধিকারী,
তোমার নামের জন্য এমন দুর্বল সাক্ষ্যের কী প্রয়োজন?
তুমি তো আমাদের বিস্ময় আর স্তব্ধতার মাঝে
নিজের জন্য এক চিরন্তন স্মৃতিস্তম্ভ গড়েছ।
কারণ যেখানে ধীরগতির শিল্পচেষ্টাকে লজ্জিত করে,
তোমার সাবলীল ছন্দ বয়ে চলে, আর প্রতিটি হৃদয়
তোমার অমূল্য বইয়ের পাতা থেকে
গভীর অনুভূতিসহ সেই ভবিষ্যদ্বাণীমূলক লাইনগুলো গ্রহণ করে,
তখন তুমি আমাদের কল্পনাকে আচ্ছন্ন করে,
অতিরিক্ত ভাবনার আতিশয্যে আমাদের পাথরে পরিণত করো;
এবং এমন জাঁকজমকের সাথে সমাধিস্থ হয়ে তুমি শুয়ে আছ,
যে রাজারাও এমন একটি কবরের জন্য মরতে চাইবেন।
৩. অন টাইম (সময়ের প্রতি)
অনন্তকালের কাছে সময়ের চূড়ান্ত পরাজয় নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ভাবনা।
ছুটে চলো ঈর্ষান্বিত সময়, যতক্ষণ না তোমার দৌড় শেষ হয়,
ডাকো সেই অলস, সিসার মতো ভারী পায়ে চলা ঘণ্টাগুলোকে,
যাদের গতি কেবল ভারী ওলনের পতনের মতো মন্থর;
আর তৃপ্ত করো নিজেকে সেইসব দিয়ে যা তোমার গর্ভ গ্রাস করে,
যা মিথ্যা আর বৃথা ছাড়া আর কিছুই নয়,
এবং কেবলই নশ্বর আবর্জনা;
এতে আমাদের ক্ষতি সামান্যই,
আর তোমার লাভও খুব কম।
কারণ যখন প্রতিটি খারাপ জিনিসকে তুমি কবর দিয়ে দেবে,
আর সবশেষে, তোমার লোভী নিজেকেই গ্রাস করবে,
তখন দীর্ঘ অনন্তকাল আমাদের আনন্দকে স্বাগত জানাবে
এক পরম চুম্বনে;
আর আনন্দ আমাদের বরণ করে নেবে এক নববধূর মতো
তার সমস্ত সঙ্গীসাথীদের নিয়ে,
যতক্ষণ না সময় স্থির হয়ে দাঁড়ায়, আর সব গতি থেমে যায়,
অনন্তকাল তার সুন্দর বাহুডোরে জড়িয়ে রাখবে
বিশ্বস্ত আত্মাকে…
৪. সং অন মে মর্নিং (মে মাসের সকালের গান)
বসন্তের এক আনন্দময় ও সুরেলা উদযাপন।
এখন সেই উজ্জ্বল ভোরের তারা, দিনের অগ্রদূত,
পূর্ব আকাশ থেকে নাচতে নাচতে আসছে, আর সাথে নিয়ে আসছে
ফুলভরা মে মাসকে, যে তার সবুজ আঁচল থেকে বিলিয়ে দিচ্ছে
হলুদ কাউস্লিপ আর ফ্যাকাশে প্রিমরোজ ফুল।
স্বাগতম হে দয়ালু মে মাস, তুমিই তো জাগিয়ে তোলো
হাসি-আনন্দ, তারুণ্য আর উষ্ণ আকাঙ্ক্ষা,
বন আর উপবন সেজেছে তোমারই সাজে,
পাহাড় আর উপত্যকা অহংকার করে তোমারই আশীর্বাদে।
এভাবেই আমরা আমাদের ভোরের গানে তোমাকে অভিবাদন জানাই,
তোমাকে স্বাগত জানাই এবং তোমার দীর্ঘ স্থায়িত্ব কামনা করি।
৫. অ্যাট আ সোলেম মিউজিক (গম্ভীর সঙ্গীতের প্রতি)
স্বর্গ ও মর্ত্যের সুরের ঐকতান নিয়ে এক চমৎকার আধ্যাত্মিক ভাবনা।
স্বর্গের আনন্দের প্রতীক, সাইরেনদের ধন্য জুটি,
আকাশে জন্ম নেওয়া সুরেলা দুই বোন, কণ্ঠ আর ছন্দ,
তোমাদের ঐশ্বরিক সুরকে যুক্ত করো, আর মিশ্র শক্তিকে কাজে লাগাও
যাতে প্রাণহীন বস্তুকেও নিশ্বাসের অনুভূতি দিয়ে বিদ্ধ করা যায়,
এবং আমাদের উচ্চ কল্পনার সামনে উপস্থাপন করো,
বিশুদ্ধ তৃপ্তির সেই অবিক্ষুব্ধ গান,
যা নীলকান্তমণি রঙের সিংহাসনের সামনে সর্বদা গাওয়া হয়
তাঁর উদ্দেশ্যে যিনি সেখানে উপবিষ্ট আছেন,
পবিত্র চিৎকার আর গম্ভীর জয়ধ্বনির মাঝে,
যেখানে উজ্জ্বল সেরাফিমরা জ্বলন্ত সারিতে দাঁড়িয়ে
তাদের উচ্চস্বরে দেবদূতের তূরী বাজাচ্ছে,
আর চেরুবদের দল হাজারো গায়কদলে বিভক্ত হয়ে
সোনার তারের অমর বীণাগুলো স্পর্শ করছে,
সেই ন্যায়পরায়ণ আত্মাদের সাথে যারা বিজয়ের তালপত্র ধারণ করেছে,
আধ্যাত্মিক স্তোত্র এবং পবিত্র গীত গেয়ে চলেছে চিরকাল;
যাতে আমরা পৃথিবীতে এক অবিচ্ছিন্ন কণ্ঠে
সেই সুরেলা শব্দের সঠিক উত্তর দিতে পারি;
যেমনটা আমরা একদা দিতাম, যতক্ষণ না অসম পাপ
প্রকৃতির সুরের সাথে বিরোধ তৈরি করল, আর এক কর্কশ কোলাহলে
সেই সুন্দর সঙ্গীতকে ভেঙে দিল যা সমস্ত সৃষ্টি তৈরি করেছিল
তাদের মহান প্রভুর জন্য, যাঁর ভালোবাসা তাদের গতিকে চালিত করত
এক নিখুঁত সুরে, যখন তারা দাঁড়িয়ে ছিল
প্রথম আনুগত্যে এবং তাদের মঙ্গলের অবস্থায়।
ওহ, আমরা যেন শীঘ্রই আবার সেই গান নতুন করে গাইতে পারি,
আর স্বর্গের সাথে সুর মেলাতে পারি, যতক্ষণ না ঈশ্বর শীঘ্রই
তাঁর স্বর্গীয় সঙ্গীতে আমাদের একত্রিত করেন,
তাঁর সাথে বসবাস করতে এবং আলোর অন্তহীন ভোরে গান গাইতে।
৬. সনেট VII: “হাউ সুন হ্যাথ টাইম, দ্য সাটল থিফ অব ইউথ”
মিল্টনের ২৩তম জন্মদিনে লেখা, যেখানে তিনি নিজের প্রতিভা এবং ঐশ্বরিক সময়ের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
কত দ্রুত সময়, যৌবনের সেই চতুর চোর,
তার ডানায় ভর করে আমার তেইশটি বছর চুরি করে নিল!
আমার দ্রুত ধাবমান দিনগুলো পূর্ণ গতিতে ছুটে চলেছে,
কিন্তু আমার বিলম্বিত বসন্তে কোনো কুঁড়ি বা ফুল দেখা যাচ্ছে না।
হয়তো আমার বাহ্যিক রূপ সত্যকে আড়াল করছে,
যে আমি পুরুষত্বের এত কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি,
আর ভেতরের পরিপক্কতা অনেক কম প্রকাশ পাচ্ছে,
যা অন্য কিছু সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা আত্মাকে সমৃদ্ধ করে।
তবুও তা কম হোক বা বেশি, দ্রুত হোক বা ধীর,
তা সর্বদা কঠোর পরিমাপে সমান থাকবে
সেই একই ভাগ্যের প্রতি, তা যতই সাধারণ বা উচ্চ হোক না কেন,
যার দিকে সময় আমাকে নিয়ে চলে এবং স্বর্গের ইচ্ছা;
সবকিছুই সার্থক, যদি আমার তা ব্যবহার করার মতো অনুগ্রহ থাকে,
যেন তা সর্বদা আমার মহান কর্ম-প্রভুর চোখের সামনে থাকে।
৭. সনেট XIX: “হোয়েন আই কনসিডার হাউ মাই লাইট ইজ স্পেন্ট” (অন্ধত্বের ওপর)
মিল্টনের সবচেয়ে বিখ্যাত সনেট, যা তিনি তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর লিখেছিলেন।
আমি যখন ভাবি কীভাবে আমার চোখের আলো ফুরিয়ে গেল,
আমার জীবনের অর্ধেক দিন পার হওয়ার আগেই, এই অন্ধকার ও বিস্তীর্ণ পৃথিবীতে,
আর সেই একটি প্রতিভা যা লুকিয়ে রাখা মৃত্যুর শামিল,
তা আমার কাছে অলস পড়ে রইল, যদিও আমার আত্মা আরও বেশি ব্যাকুল
তা দিয়ে আমার সৃষ্টিকর্তার সেবা করতে এবং উপস্থাপন করতে
আমার জীবনের সত্য হিসাব, পাছে তিনি ফিরে এসে তিরস্কার করেন;
“চোখের আলো কেড়ে নিয়ে কি ঈশ্বর দিনের পরিশ্রম দাবি করেন?”
আমি বোকার মতো প্রশ্ন করি। কিন্তু ধৈর্য, সেই অসন্তোষকে
থামিয়ে দিতে শীঘ্রই উত্তর দেয়, “ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই
মানুষের কাজ কিংবা তাঁর নিজের দেওয়া উপহারের; যারা সবচেয়ে ভালো
তাঁর মৃদু জোয়াল বহন করে, তারাই তাঁর সেরা সেবা করে। তাঁর অবস্থা
রাজকীয়। হাজার হাজার দূত তাঁর আদেশে দ্রুত ছুটে চলে
এবং স্থল ও মহাসমুদ্রে পাড়ি দেয় ক্লান্তিহীনভাবে:
তারাই সেবা করে, যারা কেবল দাঁড়িয়ে থাকে এবং অপেক্ষা করে।”
৮. সনেট XXIII: “মেথট আই স মাই লেট এসপাউসড সেন্ট”
১৬৫৮ সালে মারা যাওয়া মিল্টনের দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যাথরিন উডককের এক আবেগঘন স্বপ্ন-দর্শন।
মনে হলো আমি আমার প্রয়াত সাধ্বী স্ত্রীকে দেখলাম
অ্যালসেস্টিসের মতো কবর থেকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হয়েছে,
যাকে জোভের মহান পুত্র তার আনন্দিত স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন,
শক্তি প্রয়োগ করে মৃত্যু থেকে উদ্ধার করে, যদিও সে ছিল ফ্যাকাশে ও দুর্বল।
আমার স্ত্রী যেন প্রসবকালীন কলঙ্কের দাগ থেকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার,
পুরানো নিয়মের পবিত্রকরণ যাকে রক্ষা করেছিল,
এবং এমন রূপ, যা আমি বিশ্বাস করি আরও একবার ফিরে পাব
স্বর্গে কোনো বাধা ছাড়াই তাঁর পূর্ণ দর্শনে,
সব সাদা পোশাকে আবৃত হয়ে সে এল, তার মনের মতোই পবিত্র:
তার মুখাবয়ব ওড়নায় ঢাকা ছিল, তবুও আমার কল্পিত দৃষ্টিতে,
ভালোবাসা, মধুরতা, শুভ্রতা তার অবয়বে জ্বলজ্বল করছিল
এত স্পষ্ট যে, কোনো মুখে এর চেয়ে বেশি আনন্দ দেখিনি।
কিন্তু ওহ, যেমন সে আমাকে আলিঙ্গন করতে ঝুঁকে পড়ল,
আমি জেগে উঠলাম, সে পালিয়ে গেল এবং দিন আমার রাতের অন্ধকার ফিরিয়ে আনল।
৯. লাইসিডাস (১৬৩৭)
মিল্টনের কেমব্রিজের বন্ধু এডওয়ার্ড কিং-এর জন্য একটি রাখালিয়া শোকগাথা (প্যাস্টোরাল এলিজি)। এটি ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শোকগাথা।
আরও একবার, ওহে লরেল পাতা, এবং আরও একবার
বাদামী মার্টল লতা, চিরসবুজ আইভির সাথে,
আমি এসেছি তোমাদের শক্ত ও অপক্ব ফলগুলো ছিঁড়তে,
এবং জোরপূর্বক রুক্ষ আঙুল দিয়ে,
ঝরিয়ে দিতে তোমাদের পাতাগুলো, এই বছরটি পরিপক্ক হওয়ার আগেই।
তিক্ত বাধ্যবাধকতা এবং দুঃখজনক প্রিয় উপলক্ষ,
আমাকে বাধ্য করছে তোমাদের উপযুক্ত ঋতুকে বিঘ্নিত করতে:
কারণ লাইসিডাস মৃত, তার যৌবনের আগেই মৃত,
তরুণ লাইসিডাস, এবং সে তার কোনো সমকক্ষ রেখে যায়নি:
লাইসিডাসের জন্য কে না গান গাইবে? সে নিজে জানত
কীভাবে গান গাইতে হয় এবং মহৎ ছন্দ তৈরি করতে হয়।
সে যেন ভেসে না বেড়ায় তার এই জলীয় শয্যায়
অশ্রুহীনভাবে, এবং শুকিয়ে যাওয়া বাতাসে ছটফট না করে,
কোনো সুরেলা চোখের জলের পুরস্কার ছাড়া।
[সম্পূর্ণ কবিতাটি ধ্রুপদী রাখালিয়া আবহ, দুর্নীতিগ্রস্ত যাজকদের প্রতি তীব্র আক্রমণ সহ এগিয়ে যায় এবং খ্রিস্টীয় সান্ত্বনা ও বিখ্যাত সমাপনী লাইনের মাধ্যমে শেষ হয়: “আগামীকাল নতুন বনের পানে এবং নতুন চারণভূমির খোঁজে।”]
১০. প্যারাডাইস লস্ট, বুক ১: দ্য ইনভোকেশন (আবাহন – ১৬৬৭)
মিল্টনের মহান অমিত্রাক্ষর ছন্দের মহাকাব্যের রাজকীয় সূচনা, যা তিনি অন্ধ অবস্থায় মুখে বলে লিখিয়েছিলেন। এটি “মানুষের কাছে ঈশ্বরের পথকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করার” মূল ভাব নির্ধারণ করে।
মানুষের প্রথম অবাধ্যতা, আর সেই নিষিদ্ধ গাছের
সেই ফলটির কথা, যার নশ্বর স্বাদ
পৃথিবীতে ডেকে এনেছিল মৃত্যু এবং আমাদের সমস্ত দুঃখকষ্ট,
সেই সাথে ইডেন উদ্যান হারানো, যতক্ষণ না এক মহান মানুষ
আমাদের পুনরুদ্ধার করেন এবং সেই আনন্দময় আসনটি ফিরিয়ে দেন,
গাও, হে স্বর্গীয় মিউজ (কাব্যদেবী), যিনি হোরেব বা সিনাইয়ের
সেই গোপন চূড়ায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন
সেই রাখালকে (মুসা), যিনি প্রথম শিখিয়েছিলেন সেই মনোনীত বংশধরদের,
শুরুতে কীভাবে স্বর্গ ও মর্ত্য
জেগে উঠেছিল আদি বিশৃঙ্খলা থেকে: অথবা, যদি সায়ন পর্বত
তোমাকে বেশি আনন্দ দেয়, আর সিলোয়ার সেই জলধারা যা বয়ে যেত
ঈশ্বরের মন্দিরের ঠিক পাশ দিয়ে, আমি সেখান থেকে
আবাহন করি তোমার সাহায্য আমার এই দুঃসাহসিক গানের জন্য,
যা কোনো মাঝারি উড়াল দিয়ে আকাশ পানে ছড়াতে চায় না
অ্যাওনিয়ান পর্বতের ওপর দিয়ে, যখন এটি অনুসরণ করে
এমন কিছু যা গদ্য বা পদ্যে আগে কখনো চেষ্টা করা হয়নি।
আর প্রধানত তুমি, ওহে পবিত্র আত্মা, যিনি সমস্ত মন্দিরের চেয়ে
সৎ ও বিশুদ্ধ হৃদয়কে বেশি প্রাধান্য দাও,
আমাকে শিক্ষা দাও, কারণ তুমি তো জানো; তুমি তো প্রথম থেকেই
উপস্থিত ছিলে এবং তোমার শক্তিশালী ডানা প্রসারিত করে,
ঘুঘুর মতো সেই বিশাল অতল গহ্বরের ওপর তা প্রস্ফুটিত করতে বসেছিলে,
এবং তাকে প্রাণবন্ত করেছিলে: আমার ভেতরে যা কিছু অন্ধকার
তা আলোকিত করো, যা কিছু নিচু তা উন্নত ও সমর্থন করো;
যাতে এই মহান যুক্তির শিখরে পৌঁছে,
আমি চিরন্তন ঐশ্বরিক বিধানকে ঘোষণা করতে পারি,
এবং মানুষের কাছে ঈশ্বরের পথকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে পারি।
এই দশটি কবিতা মিল্টনের অসাধারণ পরিধিকে তুলে ধরে: যৌবনের খ্রিস্টের জন্ম ও শেকসপিয়রের উদযাপন থেকে শুরু করে সময়, প্রতিভা, অন্ধত্ব এবং বিয়োগব্যথার ব্যক্তিগত প্রতিফলন, এবং সবশেষে Paradise Lost-এর মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই মহাকাব্যে তাঁর অমিত্রাক্ষর ছন্দ ইংরেজি সাহিত্যে এর শক্তি, নমনীয়তা এবং মহিমান্বিত রূপের জন্য আজও অতুলনীয় হয়ে রয়েছে।
জন মিল্টন (১৬০৮–১৬৭৪): ইংরেজি সাহিত্যের মহাকাব্যিক প্রতিভা এবং প্যারাডাইজ লস্টের স্বৈরাচারী রচয়িতা
জন মিল্টন ইংরেজ সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, গদ্যকার, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। তিনি ইংরেজি ভাষায় সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য Paradise Lost (১৬৬৭) রচনা করেছেন, যা তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ অবস্থায় একাধিক সচিবের (amanuensis) মাধ্যমে ডিকটেট করে লিখিয়েছিলেন। এটি ইংরেজি সাহিত্যের সর্বোচ্চ শিখর বলে বিবেচিত হয়। মিল্টনের জীবন ছিল শিক্ষা, ভ্রমণ, রাজনৈতিক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত দুর্দশা এবং অসাধারণ সৃজনশীলতার সমন্বয়। তিনি শুধু কবি নন—তিনি ছিলেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থক, মুক্তচিন্তার পক্ষে লড়াইকারী এবং ঈশ্বরের পথ ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টাকারী।
শৈশব ও পরিবার: সঙ্গীত ও শিক্ষার পরিবেশ
জন মিল্টন জন্মগ্রহণ করেন ৯ ডিসেম্বর ১৬০৮ সালে লন্ডনের ব্রেড স্ট্রিটে। তাঁর পিতা জন মিল্টন সিনিয়র ছিলেন একজন সফল স্ক্রাইভেনার (লেখক ও নোটারি) এবং সুরকার। তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট ছিলেন এবং সঙ্গীত রচনায় দক্ষ ছিলেন। মা সারা জেফ্রি ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও সংস্কৃতিবান। পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত কিন্তু শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ।
মিল্টন ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। তাঁর ছোট ভাই ক্রিস্টোফার পরবর্তীকালে আইনজীবী ও রাজতন্ত্রপন্থী হয়েছিলেন। শৈশব থেকেই মিল্টন পিতার সঙ্গীতানুরাগ ও মায়ের ধর্মীয় শিক্ষায় প্রভাবিত হন। তিনি খুব অল্প বয়সে লাতিন, গ্রিক ও হিব্রু ভাষা শিখতে শুরু করেন।
শিক্ষা: কেমব্রিজের দিনগুলো
মিল্টন প্রথমে সেন্ট পলস স্কুলে পড়াশোনা করেন, যেখানে তিনি ক্লাসিক্যাল সাহিত্যে দক্ষতা অর্জন করেন। ১৬২৫ সালে তিনি কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ব্যাচেলর অব আর্টস (১৬২৯) এবং মাস্টার অব আর্টস (১৬৩২) ডিগ্রি লাভ করেন।
কেমব্রিজে তিনি “The Lady of Christ’s College” নামে পরিচিত ছিলেন—সুন্দর চেহারা ও নম্র আচরণের জন্য। এ সময় তিনি লাতিন ও ইংরেজিতে কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৬২৯ সালের ক্রিসমাসে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত “On the Morning of Christ’s Nativity”। এটি তাঁর প্রথম বড় কাব্যিক সাফল্য। কেমব্রিজে তিনি “L’Allegro” ও “Il Penseroso” নামে দুটি সঙ্গী কবিতা (companion poems) লেখেন—একটি আনন্দ ও হাসির, অন্যটি চিন্তাশীলতা ও বিষণ্ণতার প্রতীক।
প্রাথমিক সাহিত্যকর্ম ও হর্টনের নির্জনতা
১৬৩২ সালে ডিগ্রি শেষ করে মিল্টন হর্টন (বাকিংহ্যামশায়ার) গ্রামে ফিরে আসেন। সেখানে প্রায় ছয় বছর (১৬৩২–১৬৩৮) তিনি নিজের গ্রন্থাগারে গভীর অধ্যয়ন করেন—ক্লাসিক্যাল সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস ও বিজ্ঞান। এ সময় তিনি লেখেন মাস্ক (নাট্যকাব্য) Comus (১৬৩৪) এবং বিখ্যাত শোককাব্য Lycidas (১৬৩৭)। Lycidas তাঁর কেমব্রিজের বন্ধু এডওয়ার্ড কিং-এর স্মৃতিতে লেখা প্যাস্টোরাল এলিজি, যেখানে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত যাজকদের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ইতালি ভ্রমণ: রেনেসাঁর স্পর্শ
১৬৩৮ সালে মিল্টন ইউরোপ ভ্রমণে যান। তিনি ফ্রান্স, ইতালি (ফ্লোরেন্স, রোম, নেপলস) ঘুরে দেখেন। সেখানে তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেইর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন (যিনি তখন গৃহবন্দি ছিলেন)। ইতালীয় রেনেসাঁ সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্য তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি লাতিনে কবিতা লেখেন এবং ইতালীয় ভাষায় সনেট রচনা করেন। ১৬৩৯ সালে ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের খবর শুনে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংগ্রাম
ইংল্যান্ডে ফিরে মিল্টন পার্লামেন্টারিয়ানদের (পার্লামেন্টপন্থী) পক্ষ নেন। তিনি রাজা চার্লস প্রথমের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। এ সময় তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গদ্য রচনা করেন:
- Areopagitica (১৬৪৪): মুক্ত বাকস্বাধীনতার পক্ষে বিখ্যাত প্রবন্ধ। এটি আজও প্রেস ফ্রিডমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা।
- বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত ট্র্যাক্ট (Divorce Tracts): নিজের অসুখী প্রথম বিয়ে থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বিবাহবিচ্ছেদের পক্ষে যুক্তি দেন।
- Eikonoklastes (১৬৪৯): রাজা চার্লসের মৃত্যুদণ্ডের পর তাঁর প্রতিরক্ষায় লেখা বইয়ের জবাব।
১৬৪৯ সালে কমনওয়েলথ (প্রজাতন্ত্র) প্রতিষ্ঠিত হলে মিল্টন “Latin Secretary” (পররাষ্ট্র সচিব) হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি লাতিন ভাষায় আন্তর্জাতিক চিঠিপত্র লিখতেন এবং প্রজাতন্ত্রের পক্ষে প্রচার চালাতেন।
ব্যক্তিগত জীবন: বিয়ে ও দুর্দশা
১৬৪২ সালে মিল্টন ১৭ বছর বয়সী মেরি পাওয়েলকে বিয়ে করেন। কিন্তু বিয়ে সুখের হয়নি। মেরি কিছুদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে চলে যান। পরে পুনর্মিলন হয় এবং তিন সন্তান হয় (এক পুত্র ও দুই কন্যা)। মেরি ১৬৫২ সালে মারা যান।
১৬৫৬ সালে তিনি ক্যাথরিন উডকককে বিয়ে করেন। কিন্তু ১৬৫৮ সালে তিনি ও তাঁদের শিশুকন্যা মারা যান। এই দুঃখ মিল্টনের কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে (“Methought I saw my late espoused saint”)।
১৬৬৩ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন এলিজাবেথ মিনশালের সঙ্গে। এই বিয়ে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল।
অন্ধত্ব ও মহাকাব্য রচনা: প্যারাডাইজ লস্ট
মিল্টনের দৃষ্টিশক্তি ১৬৪০-এর দশক থেকে ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকে। ১৬৫২ সালের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। এরপরও তিনি কাজ চালিয়ে যান। সচিবদের (যার মধ্যে অ্যান্ড্রু মার্ভেলও ছিলেন) মাধ্যমে তিনি ডিকটেট করে লিখতেন।
১৬৫৮ সাল থেকে তিনি Paradise Lost রচনা শুরু করেন। এটি ১০ বইয়ে ১৬৬৭ সালে প্রকাশিত হয় এবং ১৬৭৪ সালে ১২ বইয়ে সংশোধিত সংস্করণ বের হয়। এই মহাকাব্যে তিনি মানুষের পতন (Fall of Man), শয়তানের চরিত্র, স্বাধীন ইচ্ছা (free will) এবং ঈশ্বরের পথ ন্যায্যতা (“justify the ways of God to men”) প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
ব্ল্যাঙ্ক ভার্স (unrhymed iambic pentameter) ব্যবহার করে মিল্টন ইংরেজি মহাকাব্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শয়তানের চরিত্র এতটাই জীবন্ত ও করুণ যে পরবর্তীকালে রোমান্টিক কবিরা (ব্লেক, শেলি) তাকে “বিদ্রোহী নায়ক” হিসেবে দেখেছেন।
১৬৭১ সালে প্রকাশিত হয় Paradise Regained (খ্রিস্টের প্রলোভনের কাহিনি) এবং Samson Agonistes (গ্রিক ট্র্যাজেডির আদলে রচিত নাটকীয় কাব্য)।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে (Restoration) মিল্টন সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কারাবন্দি হন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুক্তি পান। তিনি শেষ জীবন লন্ডনে নির্জনে কাটান। ৮ নভেম্বর ১৬৭৪ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে সেন্ট গাইলস-ইন-দ্য-ফিল্ডস চার্চে সমাহিত করা হয়।
মিল্টনের উত্তরাধিকার অপরিসীম। তিনি ইংরেজি ভাষা ও কাব্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর স্বাধীনতা, সহনশীলতা ও প্রজাতান্ত্রিক আদর্শ পরবর্তী যুগকে প্রভাবিত করেছে। উইলিয়াম ব্লেক, পার্সি শেলি, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থসহ অনেকে তাঁকে শ্রদ্ধা করেছেন। আজও Paradise Lost বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য হিসেবে পঠিত হয়।
জন মিল্টনের জীবন প্রমাণ করে যে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা (অন্ধত্ব) সৃজনশীলতাকে থামাতে পারে না। তিনি অন্ধ হয়েও ডিকটেট করে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য রচনা করেছেন—এটি তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও প্রতিভার চূড়ান্ত প্রমাণ।