ডব্লিউ. বি. ইয়েটস (W. B. Yeats, ১৮৬৫–১৯৩৯)
আইরিশ মিথিক সিম্বলিস্ট কবি — যাঁর প্রাথমিক মাস্টারপিস ১৯১৯ সালের দিকে চূড়ায় পৌঁছায়
ডব্লিউ. বি. ইয়েটস ছিলেন আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি, নাট্যকার ও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত (১৯২৩)। তিনি আইরিশ পুরাণ, লোককথা, প্রেম, জাতীয়তাবাদ, আধ্যাত্মিকতা ও প্রতীকবাদকে মিশিয়ে এক অনন্য কাব্যভাষা তৈরি করেন। তাঁর প্রাথমিক ও মধ্যযুগের মাস্টারপিস — The Wind Among the Reeds, In the Seven Woods, The Wild Swans at Coole (১৯১৯) — পুরাণ, স্বপ্ন ও বাস্তবতার মেলবন্ধন। পরবর্তীকালে তিনি আরও দার্শনিক ও রাজনৈতিক হয়ে ওঠেন (The Tower, The Winding Stair)।
১. The Lake Isle of Innisfree (ইনিসফ্রি হ্রদের দ্বীপ)
আমি উঠে যাব ইনিসফ্রিতে, ছোট কুঁড়েঘর বানাব কাদা ও লতায়,
নয়টি শিমের সারি লাগাব, মৌমাছির চাক রাখব,
আর শান্তিতে বাস করব — যেখানে ক্রিকেট গান গায় আর শান্তি নামে।
সকালে আমি উঠব, যখন কুয়াশা নামে হ্রদে,
আর শুনব ঢেউয়ের শব্দ — হালকা, মৃদু, নির্জন।
আর রাতে তারার আলোয় ঘুমাব — শান্তির দেশে।
২. When You Are Old (যখন তুমি বুড়ো হবে)
যখন তুমি বুড়ো হবে, ধূসর চুলে, ঘুমিয়ে পড়বে চেয়ারে,
এই বই পড়বে, ধীরে ধীরে, আর স্বপ্ন দেখবে —
যে তোমাকে ভালোবেসেছিল একদিন, গভীরভাবে।
যখন তুমি বুড়ো হবে, আর সবাই তোমায় ভুলে যাবে,
তখন মনে পড়বে — একজন মানুষ ছিল,
যে তোমার চোখের আলোয় তার স্বপ্ন দেখত।
৩. The Song of Wandering Aengus (ঘুরে বেড়ানো এঙ্গাসের গান)
আমি বনে গিয়েছিলাম এক সকালে,
একটা হ্যাজেল ডাল কেটে,
আর একটা রূপোর মাছ ধরেছিলাম —
যে মাছ হয়ে উঠল এক সুন্দরী মেয়ে।
সে আমার দিকে তাকাল, আর বলল,
“তুমি কে?” — আর আমি বললাম, “আমি এঙ্গাস।”
আর সে চলে গেল — আর আমি তাকে খুঁজে বেড়াই
সারা জীবন, সারা পৃথিবী জুড়ে।
৪. He Wishes for the Cloths of Heaven (স্বর্গের কাপড়ের জন্য তার ইচ্ছা)
যদি আমার হাতে থাকত স্বর্গের কাপড়,
নক্ষত্রের আলোয় বোনা, রাতের নীল আকাশ,
তাহলে আমি তোমার পায়ের তলায় বিছিয়ে দিতাম —
কিন্তু আমার কাছে শুধু স্বপ্ন আছে।
তাই আমি তোমার পায়ের তলায় বিছিয়ে দিই আমার স্বপ্ন —
নরম পায়ে হাঁটো, কারণ তুমি হাঁটছ আমার স্বপ্নের উপর।
৫. The Wild Swans at Coole (কুলের বন্য রাজহাঁস)
আমি গুনেছি ঊনপঞ্চাশটি রাজহাঁস কুলের জলে,
উনিশ বছর আগে — যখন প্রথম এসেছিলাম এখানে।
আর এখনও তারা উড়ে যায়, আর ডানা ঝাপটায়,
আর আমার হৃদয় ভেঙে যায় — কারণ তারা এখনও সুন্দর।
আর আমি জানি — তারা উড়ে যাবে আবার,
আর আমি থাকব এখানে, একা, বুড়ো হয়ে।
৬. Easter, 1916 (ইস্টার, ১৯১৬)
আমি তাদের চিনতাম — যারা হেঁটেছিল রাস্তায়,
আর কথা বলেছিল রাজনীতি নিয়ে।
আর হঠাৎ তারা হয়ে উঠল নায়ক —
যারা মরল ইস্টার বিদ্রোহে।
“সব বদলে গেছে, সম্পূর্ণ বদলে গেছে:
একটি ভয়ংকর সৌন্দর্য জন্ম নিয়েছে।”
৭. September 1913 (সেপ্টেম্বর ১৯১৩)
আপনারা যারা জমি কিনেছেন, আর বাড়ি বানিয়েছেন,
আর বলেন — “আমরা শান্তি চাই” —
আপনারা কি জানেন, রোমান্টিক আয়ারল্যান্ড মরে গেছে?
আর যারা মরেছে — তারা ছিল স্বপ্নদ্রষ্টা।
৮. The Second Coming (দ্বিতীয় আগমন)
কেন্দ্র আর ধরে রাখতে পারছে না;
জিনিসগুলো ছড়িয়ে পড়ছে; নৈরাজ্য ছড়াচ্ছে পৃথিবীতে।
রক্তাক্ত জোয়ার ছুটছে, আর সব জায়গায়
নির্দোষতা ডুবে যাচ্ছে।
আর কী জানোয়ার, তার সময় এসেছে —
বেথলেহেমের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে।
৯. A Prayer for My Daughter (আমার মেয়ের জন্য প্রার্থনা)
যখন আমার মেয়ে বড় হবে,
আমি চাই সে হোক সুন্দর — কিন্তু বুদ্ধিমতী।
আমি চাই সে হোক শান্ত, আর ভালোবাসুক
সরল জিনিস — গাছ, ফুল, আর মানুষ।
আর যেন সে কখনো হিংসা না করে,
আর যেন সে জানে — সৌন্দর্য আসে ভিতর থেকে।
১০. Leda and the Swan (লেদা ও রাজহাঁস)
একটা ধাক্কা — আর তারপর ভয়ংকর ডানা ঝাপটানি।
রাজহাঁসের ঠোঁট তার ঘাড়ে — আর সে কাঁপছে।
আর তারপর — সেই মুহূর্ত যখন দেবতা মানুষ হয়ে যায়,
আর ইতিহাসের ভয়ংকর সন্তান জন্ম নেয়।
ডব্লিউ. বি. ইয়েটস (W. B. Yeats, ১৮৬৫–১৯৩৯)
আইরিশ মিথিক সিম্বলিস্ট কবি — যাঁর প্রাথমিক মাস্টারপিস ১৯১৯ সালের দিকে চূড়ায় পৌঁছায়
ডব্লিউ. বি. ইয়েটস ছিলেন আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিক কবি, নাট্যকার, সমালোচক ও ১৯২৩ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত। তিনি আইরিশ পুরাণ, লোককথা, প্রতীকবাদ, আধ্যাত্মিকতা ও জাতীয়তাবাদকে মিশিয়ে এক অনন্য কাব্যভাষা তৈরি করেন। তাঁর প্রাথমিক ও মধ্যযুগের মাস্টারপিস — The Wind Among the Reeds (১৮৯৯), In the Seven Woods (১৯০৩), The Wild Swans at Coole (১৯১৯) — পুরাণ, স্বপ্ন, প্রেম ও বাস্তবতার গভীর মেলবন্ধন। পরবর্তীকালে তিনি আরও দার্শনিক, রাজনৈতিক ও আধুনিক হয়ে ওঠেন (The Tower, The Winding Stair)। ইয়েটস আইরিশ লিটারারি রিভাইভালের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এবং অ্যাবে থিয়েটারের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর কবিতা শুধু আয়ারল্যান্ডের নয় — বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
এই বিস্তারিত জীবনীতে তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণ জীবন, সাহিত্যিক বিপ্লব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক জীবন ও অমর উত্তরাধিকার তুলে ধরা হলো।
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন (১৮৬৫–১৮৮০)
উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস জন্মগ্রহণ করেন ১৩ জুন ১৮৬৫ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের স্যান্ডিমাউন্টে। তাঁর পিতা জন বাটলার ইয়েটস ছিলেন একজন বিখ্যাত প্রতিকৃতি চিত্রশিল্পী। মাতা সুসান পোলেক্সফেন ছিলেন স্লাইগোর (Sligo) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। ইয়েটসের শৈশব কেটেছে ডাবলিন ও লন্ডনের মধ্যে যাতায়াতে। কিন্তু সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে স্লাইগোতে — যেখানে তাঁর মাতামহ-মাতামহীর সঙ্গে থেকে তিনি আইরিশ লোককথা, পুরাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হন।
শৈশব থেকেই তিনি কবিতা ও চিত্রকলায় আগ্রহী ছিলেন। পিতার প্রভাবে তিনি প্রথমে চিত্রকলা শিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরে সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
শিক্ষা ও লন্ডন-আয়ারল্যান্ড যাতায়াত (১৮৮০–১৮৯০)
ইয়েটস লন্ডনের গডলফিন স্কুল ও ডাবলিনের ইরাসমাস স্মিথ হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি মেট্রোপলিটান স্কুল অব আর্টে ভর্তি হন, কিন্তু শিল্পকলায় আগ্রহ কমে যায়। ১৮৮০-এর দশকে তিনি লন্ডনে থেকে থিওসফি (Theosophy) ও গোল্ডেন ডন (Hermetic Order of the Golden Dawn) সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হন — যা তাঁর আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী কবিতায় গভীর প্রভাব ফেলে।
এই সময় তিনি আইরিশ পুরাণ ও লোককথা সংগ্রহ করতে শুরু করেন। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ The Wanderings of Oisin — যেখানে আইরিশ পুরাণের কিংবদন্তি ওয়ারিয়র ওইসিনের কাহিনি আছে।
সাহিত্যিক শুরু ও আইরিশ লিটারারি রিভাইভাল (১৮৯০–১৯০০)
১৮৯০-এর দশকে ইয়েটস আইরিশ লিটারারি রিভাইভালের নেতৃত্ব দেন। তিনি লেডি অগাস্টা গ্রেগরি, জন মিলিংটন সিঙ্গে ও অন্যান্যদের সঙ্গে অ্যাবে থিয়েটার (Abbey Theatre) প্রতিষ্ঠা করেন (১৯০৪)। এই থিয়েটার আইরিশ জাতীয়তাবাদী নাটকের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় রোমান্টিকতা, প্রতীকবাদ ও আইরিশ পুরাণের মিশ্রণ দেখা যায়। The Wind Among the Reeds (১৮৯৯) ও In the Seven Woods (১৯০৩) তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। এই সময় তিনি মৌড গন (Maud Gonne) — একজন সুন্দরী আইরিশ জাতীয়তাবাদী নেত্রী — এর প্রতি গভীর প্রেমে পড়েন। এই অপূর্ণ প্রেম তাঁর অনেক কবিতায় (যেমন When You Are Old) প্রতিফলিত হয়েছে।
মাস্টারপিসের সময়কাল — ১৯১৯ সালের দিকে চূড়া (১৯০০–১৯১৯)
ইয়েটসের প্রাথমিক মাস্টারপিসের চূড়া The Wild Swans at Coole (১৯১৯)। এই সংকলনে রয়েছে আইকনিক কবিতা যেমন The Wild Swans at Coole, The Lake Isle of Innisfree, The Song of Wandering Aengus, He Wishes for the Cloths of Heaven। এখানে তিনি প্রকৃতি, প্রেম, সময়ের অপরিবর্তনীয়তা ও আইরিশ পুরাণকে প্রতীকী ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
এই সময় তিনি আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯১৬ সালের ইস্টার বিদ্রোহের পর তিনি Easter, 1916 লেখেন — যেখানে তিনি বিদ্রোহীদের প্রশংসা করেছেন, কিন্তু সহিংসতার সমালোচনাও করেছেন।
বিবাহ, পরিবার ও পরবর্তী কাব্য (১৯১৭–১৯৩০)
১৯১৭ সালে ইয়েটস বিয়ে করেন জর্জি হাইড-লিস (Georgie Hyde-Lees) — একজন তরুণী যিনি আধ্যাত্মিকতায় আগ্রহী ছিলেন। তাঁদের দুটি সন্তান — অ্যান ও মাইকেল। স্ত্রীর সঙ্গে “অটোমেটিক রাইটিং” (স্বয়ংক্রিয় লেখা) সেশন ইয়েটসের পরবর্তী কবিতায় গভীর প্রভাব ফেলে — বিশেষ করে A Vision (১৯২৫) গ্রন্থে।
এই সময় তাঁর কবিতা আরও জটিল, দার্শনিক ও আধুনিক হয়ে ওঠে। The Tower (১৯২৮) ও The Winding Stair and Other Poems (১৯২৯) তাঁর শ্রেষ্ঠ পরবর্তীকালের সংকলন। এখানে রয়েছে Sailing to Byzantium, The Second Coming, Leda and the Swan, A Prayer for My Daughter — যেখানে ইতিহাস, সভ্যতার পতন, যৌনতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীকী চিত্র ফুটে উঠেছে।
রাজনীতি, সিনেটর জীবন ও শেষ বছর (১৯২০–১৯৩৯)
১৯২২ সালে আয়ারল্যান্ড স্বাধীন হলে ইয়েটস আইরিশ ফ্রি স্টেটের সিনেটর নির্বাচিত হন। তিনি জাতীয়তাবাদী ছিলেন, কিন্তু চরমপন্থী সহিংসতার বিরোধী ছিলেন। ১৯২৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান — “অনুপ্রাণিত কবিতার জন্য যা জাতির আত্মাকে প্রকাশ করে”।
শেষ জীবনে তিনি ফ্রান্সের রোকব্রুন-ক্যাপ-মার্তিনে থাকতেন। স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ২৮ জানুয়ারি ১৯৩৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে আয়ারল্যান্ডের ড্রামক্লিফে সমাহিত করা হয় — যেখানে তাঁর পূর্বপুরুষদের কবর আছে।
উত্তরাধিকার ও প্রভাব
ইয়েটস আধুনিক কবিতার অন্যতম স্তম্ভ। তিনি:
- আইরিশ পুরাণকে বিশ্বসাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- প্রতীকবাদ ও আধুনিকতাবাদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন।
- পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের (যেমন: টি. এস. এলিয়ট, সিমাস হিনি) প্রভাবিত করেন।
- তাঁর কবিতা আজও পাঠককে মুগ্ধ করে তার প্রতীকী গভীরতা, সংগীতময়তা ও মানবিক আবেগে।
ইয়েটস প্রমাণ করেছেন যে, কবিতা শুধু সৌন্দর্য নয় — এটি জাতির আত্মা, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রতিফলন।