ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ড সীমান্তের নিচে বিগ ব্যাং-এর রহস্য উন্মোচনকারী মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক যন্ত্র
সার্ন (CERN)-এর ‘লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার’ (LHC) হলো মানুষের বৈজ্ঞানিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৌশলগত দক্ষতার এক অনন্য চূড়া। জেনেভার কাছে ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ডের সীমান্ত জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটর বা কণা ত্বরকটি মাটির ৫০ থেকে ১৭৫ মিটার গভীরে একটি ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার সুড়ঙ্গের মধ্যে অবস্থিত। এটি প্রায় আলোর গতিতে ছুটতে থাকা প্রোটন কণাগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড শক্তিতে সংঘর্ষ ঘটায়, যা মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি মুহূর্ত অর্থাৎ ‘বিগ ব্যাং’ (Big Bang)-এর ঠিক পরের চরম পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এর ফলে পদার্থবিজ্ঞানীরা পদার্থের মৌলিক উপাদান এবং মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী বল বা শক্তিগুলো নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পান। শুরু থেকেই লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার একের পর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার উপহার দিয়ে আসছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১২ সালে ‘হিগস বোসন’ (Higgs boson) কণার আবিষ্কার। মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং এর গঠন সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের সীমানাকে এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিত করে চলেছে।
মানব ইতিহাসের অন্যতম জটিল এই যন্ত্রটি একটি অনন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক, যেখানে ১০০টিরও বেশি দেশের হাজার হাজার বিজ্ঞানী একসাথে কাজ করছেন। এর কার্যক্রমের মাধ্যমে সৃষ্টির আদিকালের সেই চরম পরিস্থিতিকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়, যা থেকে প্রাপ্ত তথ্য পদার্থবিজ্ঞানের চেনা জগৎকে পুনর্গঠন করছে এবং নতুন প্রজন্মের গবেষকদের অনুপ্রাণিত করছে।
মাটির নিচে এক বিশাল বৃত্তাকার বলয় নির্মাণ
এলএইচসি (LHC)-এর মূল কাঠামোটি ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বৃত্তাকার রিং, যা সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট বা অতিপরিবাহী চৌম্বক এবং কণা ত্বরান্বিত করার নানাবিধ যন্ত্রাংশ দিয়ে গঠিত। তরল হিলিয়াম ব্যবহার করে এই শক্তিশালী চৌম্বকগুলোকে (যার সংখ্যা প্রায় ৭,০০০) মাইনাস ২৭১.৩° সেলসিয়াসে (যা পরম শূন্য তাপমাত্রার চেয়ে মাত্র ১.৯ ডিগ্রি ওপরে) ঠান্ডা রাখা হয়। এই চৌম্বকগুলো আলোর গতির প্রায় কাছাকাছি পৌঁছানো দুটি প্রোটন কণার স্রোতকে বিপরীত দিক থেকে ধরে রাখতে এবং ঘোরাতে সাহায্য করে। এই কণার স্রোত বা বিমগুলো মূলত চারটি প্রধান কেন্দ্রে একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, যেখানে স্থাপন করা হয়েছে বিশালাকার সব ডিটেক্টর বা সনাক্তকরণ যন্ত্র—অ্যাটলাস (ATLAS), সিএমএস (CMS), অ্যালিস (ALICE) এবং এলএইচসিবী (LHCb)। কণার এই মহাধাক্কার ফলে যে ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়, এই ডিটেক্টরগুলো তা নিখুঁতভাবে ধরে ফেলে।
১৯৮০-এর দশকে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল, যেখানে আগে থেকে থাকা লার্জ ইলেকট্রন-পজিট্রন কোলাইডারের সুড়ঙ্গটিকে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৪ সালে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায় এবং এটি নির্মাণে প্রায় ১০ বিলিয়ন সুইস ফ্রাংক খরচ হয়। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে এর প্রথম পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হলেও একটি বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে মূল কাজ কিছুটা পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০১০ সালে প্রতিটি বিমে ৩.৫ টেভ (TeV) শক্তিতে প্রোটন সংঘর্ষের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তীতে এর তৃতীয় ধাপে (Run 3) ১৩.৬ টেভ (TeV)-এ গিয়ে পৌঁছায়।
এর বিশালতার পরিমাপ করা সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। প্রতিটি প্রোটন বিমে ২,৮০৮টি পর্যন্ত ছোট ছোট গুচ্ছ বা বাঞ্চ থাকে এবং প্রতিটিতে থাকে প্রায় ১১,০০০ কোটি প্রোটন। যখন এটি পূর্ণ শক্তিতে চলে, তখন প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০ কোটি বার কণাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে, যদিও এর মধ্যে মাত্র সামান্য কিছু সংঘর্ষই পদার্থবিজ্ঞানের নতুন তথ্য দিতে পারে। কণা চলাচলের পাইপের ভেতরের শূন্যতা বা ভ্যাকুয়াম মহাকাশের শূন্যতার চেয়েও বেশি ফাঁকা, আর এর ভেতরের শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র কণাগুলোর পথকে অবিশ্বাস্য নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
বিগ ব্যাং-এর পুনরাবৃত্তি: শক্তির শেষ সীমানায় বিজ্ঞান
এলএইচসি-এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম এক সেকেন্ডের এক লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ে যে চরম তাপমাত্রা এবং শক্তির উপস্থিতি ছিল, তা কৃত্রিমভাবে ল্যাবরেটরিতে ফিরিয়ে আনা। উচ্চ শক্তিতে প্রোটনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন যেখানে আদিম ও মৌলিক কণাগুলো ভেসে ওঠে। এর ফলে প্রকৃতির বিরল সব প্রক্রিয়া এবং ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ (Standard Model)-এর বাইরের নতুন কোনো পদার্থবিদ্যার সন্ধান পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এখানকার বিভিন্ন পরীক্ষায় সফলভাবে ‘কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা’ (Quark-gluon plasma) তৈরি করা সম্ভব হয়েছে—যা মূলত মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদিলগ্নে ছড়িয়ে থাকা কণার এক আদিম স্যুপ। এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিস্তর গবেষণা করছেন। অ্যালিস (ALICE) পরীক্ষা থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক তথ্য কণার এই সংঘর্ষের ভেতরের যৌথ আচরণ সম্পর্কে এমন সব অভূতপূর্ব ধারণা দিয়েছে, যা প্রোটন সংঘর্ষের চেনা নিয়মকেও ছাড়িয়ে যায়।
এছাড়া এই যন্ত্রটির সাহায্যে ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তু, সুপারসিমেট্রিক কণা এবং মহাবিশ্বে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের (Matter-antimatter) মধ্যকার অসামঞ্জস্যতার কারণ খোঁজা হচ্ছে। ২০২৬ সালেও এর নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমে নিত্যনতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে কিছু কণার অদ্ভুত আচরণ স্ট্যান্ডার্ড মডেলের চেনা ধারণার বাইরে নতুন কোনো শক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হিগস বোসন কণার সেই ঐতিহাসিক আবিষ্কার
এলএইচসি-এর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১২ সালের ৪ঠা জুলাই। সেদিন অ্যাটলাস (ATLAS) এবং সিএমএস (CMS) গবেষক দল যৌথভাবে ঘোষণা করে যে তারা এমন একটি নতুন কণা খুঁজে পেয়েছে, যা বিজ্ঞানের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘হিগস বোসন’ (Higgs boson) বা ঈশ্বর কণার সাথে হুবহু মিলে যায়। ১৯৬৪ সালে পিটার হিগস, ফ্রাঁসোয়া এংলার্ট এবং রবার্ট ব্রাউট এই কণার তাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছিলেন। এই কণাটিই ব্যাখ্যা করে যে কীভাবে মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো হিগস ক্ষেত্রের (Higgs field) সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের ভর বা ওজন লাভ করে।
এই আবিষ্কার কণা পদার্থবিজ্ঞানের ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’কে পূর্ণতা দেয় এবং এর স্বীকৃতিস্বরূপ পিটার হিগস ও ফ্রাঁসোয়া এংলার্ট ২০১৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এরপর থেকে বিজ্ঞানীরা হিগস বোসনের বৈশিষ্ট্যগুলো আরও নিখুঁতভাবে পরিমাপ করছেন। এলএইচসি ইতিমধ্যেই কোটি কোটি হিগস বোসন কণা তৈরি করেছে, যা বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার এনে দিয়েছে। এই আবিষ্কার বিজ্ঞানের এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে, যার সাহায্যে প্রকৃতির অন্যান্য অজানা রহস্য ভেদ করার চেষ্টা চলছে।
প্রধান চারটি পরীক্ষা ও তাদের ভূমিকা
LHC-এর সুড়ঙ্গের চারদিকে প্রধান চারটি ডিটেক্টর বা সনাক্তকরণ যন্ত্র রয়েছে:
- ATLAS এবং CMS: এগুলো মূলত সব ধরণের কাজে ব্যবহারের উপযোগী সাধারণ ডিটেক্টর, যা হিগস কণার আবিষ্কার এবং নতুন কোনো কণার সন্ধান পাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এদের আকার এতটাই বিশাল যে অ্যাটলাস (ATLAS) ডিটেক্টরের ভেতরে অনায়াসে একটি ১২ তলা ভবন ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে।
- ALICE: এটি মূলত ভারী আয়নগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়ে ‘কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা’ এবং পরমাণুর ভেতরের শক্তিশালী নিউক্লীয় বল নিয়ে গবেষণা করে।
- LHCb: এটি মূলত ‘বিউটি কোয়ার্ক’ (Beauty quark) নামক কণার ওপর নজর রাখে, যা মহাবিশ্বে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্য এবং কণার বিরল ক্ষয় প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে।
প্রতিটি ডিটেক্টরে সিলিকন ট্র্যাকার এবং ক্যালোরিমিটারের মতো অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে, যা থেকে প্রতি বছর যে বিশাল পরিমাণ তথ্য (Petabytes of data) উৎপন্ন হয়, তা একটি বৈশ্বিক কম্পিউটিং গ্রিডের মাধ্যমে সারাবিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
চ্যালেঞ্জ, আধুনিকীকরণ এবং হাই-লুমিনোসিটি যুগ
এলএইচসি-কে রক্ষণাবেক্ষণ এবং আরও উন্নত করার জন্য বেশ কয়েকবার বন্ধ রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এর একটি বড় ধরণের দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার কাজ (Long Shutdown 3) শুরু হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো একে ‘হাই-লুমিনোসিটি এলএইচসি’ (HiLumi LHC) বা উচ্চ-উজ্জ্বলতার কোলাইডারে রূপান্তর করা। ২০৩০ সালের দিকে এটি যখন পূর্ণ শক্তিতে কাজ শুরু করবে, তখন এর কণা সংঘর্ষের হার আগের চেয়ে ১০ গুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা হিগস বোসন এবং অন্যান্য বিরল মহাজাগতিক ঘটনাগুলো আরও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ পাবেন।
এই আধুনিকীকরণের জন্য উন্নত প্রযুক্তির চৌম্বক এবং বিম ঘোরানোর বিশেষ ব্যবস্থা (Crab cavities) যোগ করা হচ্ছে। হাই-লুমিনোসিটি এলএইচসি-এর লক্ষ্য হলো কোটি কোটি নতুন হিগস বোসন কণা তৈরি করে পদার্থবিজ্ঞানের চেনা সীমানাকে আরও প্রসারিত করা।
বৈশ্বিক প্রভাব এবং ভবিষ্যতের দিগন্ত
মৌলিক বিজ্ঞান আবিষ্কারের পাশাপাশি এলএইচসি-এর প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও অবদান রাখছে। যেমন—চিকিৎসাক্ষেত্রে উন্নত মেডিকেল ইমেজিং, কম্পিউটিং এবং মেটেরিয়াল সায়েন্সের অনেক অগ্রগতি এই সার্নের গবেষণার হাত ধরেই এসেছে। এটি সফল আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা মানব সমাজের সার্বিক কল্যাণে ভূমিকা রাখছে।
ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই এর উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিউচার সার্কুলার কোলাইডার’ (Future Circular Collider)। এটি হবে একটি ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশালাকার মেশিন। ২০৪০ সালের দিকে যখন বর্তমান এলএইচসি-এর কার্যকাল শেষ হবে, তখন এই নতুন কোলাইডারটি মহাবিশ্বের আরও গভীর রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব নেবে।
বর্তমান সময়েও লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার এমন সব কণার আচরণ আমাদের সামনে নিয়ে আসছে যা প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এই নতুন নতুন তথ্য বিজ্ঞানীদের প্রতিনিয়ত নতুন গবেষণায় মগ্ন রাখছে।
লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার হলো মানুষের কৌতূহল এবং অসীম বুদ্ধিমত্তার এক অনন্য স্মৃতিস্তম্ভ। মাটির গভীরে, এক সুক্ষ্ম অতিপরিবাহী বলয়ের মাঝে মানুষ কণাগুলোর মহাধাক্কা ঘটিয়ে চলেছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম রহস্যগুলো উন্মোচনের আশায়—ওজনের উৎস থেকে শুরু করে ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি এবং সৃষ্টির প্রথম মুহূর্তের গল্প। ভবিষ্যতের উচ্চ-উজ্জ্বলতার যুগে পা রাখার সাথে সাথে এলএইচসি আমাদের আরও বড় কোনো সত্যের সন্ধান দেবে, যা হয়তো আগামী দিনে বিজ্ঞানের পাঠ্যবইগুলোকে নতুন করে লিখিয়ে নেবে এবং আমাদের বাস্তবতার মূল ভিত্তিকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করবে।