কবিতার খাতা থেকে – সপ্তম

হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডেরোজিও (Henry Louis Vivian Derozio, ১৮০৯–১৮৩১)
ভারতীয় দেশপ্রেমিক ইংরেজি কবিতার অগ্রদূত — যিনি তরুণ বয়সেই জ্বালিয়ে তুলেছিলেন স্বাধীনতার আগুন

হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডেরোজিও ছিলেন আধুনিক ভারতীয় ইংরেজি কবিতার অন্যতম প্রথম ও সবচেয়ে উজ্জ্বল কণ্ঠস্বর। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত এই তরুণ কবি মাত্র ২২ বছর বয়সে মারা যান, কিন্তু স্বল্প জীবনে তিনি যে দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছেন, তা আজও অনন্য। তিনি হিন্দু কলেজের (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক হিসেবে “ইয়ং বেঙ্গল” আন্দোলনের প্রেরণা ছিলেন। তাঁর কবিতায় ভারতের গৌরব, ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও মানবতাবাদ ফুটে উঠেছে।

ডেরোজিও ইংরেজিতে লিখেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতা ছিল ভারতের প্রথম সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ইংরেজি কাব্য।

১. ভারতের বীণা (The Harp of India)

(তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা — ভারতের হারানো গৌরব ও পুনর্জাগরণের আকাঙ্ক্ষা)

ভারতের বীণা, তুমি কি চিরকাল নীরব থাকবে?
তোমার তারগুলো কি চিরতরে ছিঁড়ে যাবে?
যেখানে একদিন দেবতারা গান গেয়েছেন,
সেখানে কি এখন শুধু নীরবতা বিরাজ করবে?

জাগো, ওহে বীণা! জাগো আবার!
তোমার সুরে ভারতের গৌরব ফিরিয়ে আনো।
যে দেশ একদিন সোনার চূড়ায় দাঁড়িয়েছিল,
সেই দেশ আবার জেগে উঠুক তোমার সুরে।

২. আমার জন্মভূমি ভারতকে (To India – My Native Land)

(দেশপ্রেমের শক্তিশালী ঘোষণা)

আমার জন্মভূমি ভারত, তোমাকে আমি ভালোবাসি!
তোমার পাহাড়, তোমার নদী, তোমার সমতল ভূমি —
সবকিছু আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে।
তোমার গৌরবের দিনগুলো আমি স্বপ্নে দেখি।

তুমি যখন জেগে উঠবে, তখন বিশ্ব তোমাকে দেখবে।
তোমার সন্তানরা আবার গর্বের সঙ্গে বলবে —
“আমরা ভারতের সন্তান!”
জাগো, ওহে মাতৃভূমি! জাগো আবার!

৩. দাসের স্বাধীনতা (Freedom to the Slave)

(দাসপ্রথা ও মানবাধিকারের প্রতিবাদ)

দাস, তুমি কি চিরকাল শৃঙ্খলে বাঁধা থাকবে?
তোমার হাত-পা কি চিরতরে শেকলে আটকে থাকবে?
না! স্বাধীনতার আলো তোমার জন্যও জ্বলছে।
তুমি মানুষ — তুমিও ঈশ্বরের সন্তান।

ভাঙো শৃঙ্খল! ছুড়ে ফেলো দাসত্বের বেড়ি!
তোমার আত্মা স্বাধীন — তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
জাগো, ওহে দাস! জাগো আবার!
স্বাধীনতার সূর্য তোমার জন্যও উঠেছে।

৪. জঙ্গিহীরার ফকির (The Fakeer of Jungheera) — অংশ

(দীর্ঘ আখ্যানকাব্যের একটি অংশ — প্রেম ও বিদ্রোহের গল্প)

জঙ্গিহীরার পাহাড়ে এক ফকির বাস করত,
তার চোখে ছিল অদম্য আগুন, হৃদয়ে ছিল বিদ্রোহ।
সে প্রেম করেছিল এক রাজকন্যাকে,
আর সেই প্রেমের জন্য লড়াই করেছিল সমাজের বিরুদ্ধে।

তার গানে ছিল স্বাধীনতার সুর,
তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
সে বলত — “প্রেমই সত্য, প্রেমই মুক্তি।
যে প্রেমের জন্য লড়ে, সে-ই সত্যিকারের মানুষ।”

৫. হিন্দু কলেজের ছাত্রদের প্রতি সনেট (Sonnet to the Pupils of the Hindu College)

(তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশে লেখা অনুপ্রেরণামূলক সনেট)

তোমরা যে আলো জ্বালিয়েছ, তা নিভবে না।
তোমাদের মনে যে প্রশ্ন জেগেছে, তা থামবে না।
তোমরা যে সত্য খুঁজছ, তা পাবে।
তোমরা যে স্বাধীনতা চাও, তা আসবে।

জাগো, ওহে তরুণরা! জাগো!
ভারত তোমাদের অপেক্ষায় আছে।
তোমাদের জ্ঞান ও সাহস দিয়ে
এক নতুন ভারত গড়ে তোলো।

৬. অনাথ মেয়ে (The Orphan Girl)

(সামাজিক সহানুভূতির কবিতা)

একটি ছোট মেয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে,
তার চোখে নেই মা-বাবার ছায়া।
সে অনাথ — সমাজ তাকে ভুলে গেছে।
কিন্তু তার হৃদয়ে এখনও আশা জ্বলে।

হে সমাজ! তুমি কি দেখো না তার কান্না?
হে ঈশ্বর! তুমি কি শোনো না তার প্রার্থনা?
এই অনাথ মেয়েও তোমার সন্তান।
তাকে ভালোবাসো, তাকে আশ্রয় দাও।

৭. হিন্দুস্থানী গায়কের গান (Song of the Hindoostanee Minstrel)

(ভারতীয় সংস্কৃতি ও সুরের প্রতি ভালোবাসা)

আমি হিন্দুস্থানী গায়ক — আমার গানে
ভারতের আত্মা কথা বলে।
আমার বীণায় বাজে গঙ্গার সুর,
আমার কণ্ঠে ওঠে হিমালয়ের গান।

আমি গাই — প্রেমের গান, বীরত্বের গান,
স্বাধীনতার গান।
আমার সুরে ভারত জেগে ওঠে,
আমার সুরে ভারত হাসে।

৮. এক বন্ধুর প্রতি (Lines to a Friend)

(বন্ধুত্ব ও আদর্শের কবিতা)

তুমি আমার বন্ধু — আমার সঙ্গী
এই অন্ধকার পথে।
তোমার সঙ্গে আমি স্বপ্ন দেখি
এক নতুন ভারতের।

তুমি আমাকে শক্তি দাও,
তুমি আমাকে আশা দাও।
একসঙ্গে আমরা লড়বো —
সত্যের জন্য, স্বাধীনতার জন্য।

৯. চাঁদের প্রতি (To the Moon)

(প্রকৃতি ও রোমান্টিক অনুভূতি)

ওহে চাঁদ, তুমি আকাশে একা জ্বলো,
তোমার আলোয় পৃথিবী হাসে।
তুমি দেখো আমার হৃদয়ের কান্না,
তুমি শোনো আমার নীরব প্রার্থনা।

তোমার আলোয় আমি স্বপ্ন দেখি —
এক সুন্দর ভবিষ্যতের।
ওহে চাঁদ, তুমি সাক্ষী থেকো —
আমার ভালোবাসা চিরকাল থাকবে।

১০. হাঁটার সময় (A Walk by Moonlight) — অংশ

(প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি)

চাঁদের আলোয় আমি হাঁটছি একা,
পথের দু’পাশে গাছের ছায়া নাচছে।
বাতাসে ভেসে আসছে ফুলের গন্ধ,
আর আমার হৃদয়ে জেগে উঠছে প্রশ্ন —
“জীবন কী? স্বাধীনতা কী?”

এই রাতে আমি অনুভব করি —
ভারত জেগে উঠছে।
আমি একা নই — লক্ষ লক্ষ আত্মা
আমার সঙ্গে হাঁটছে এই পথে।

হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডেরোজিও (Henry Louis Vivian Derozio, ১৮০৯–১৮৩১)

উগ্র তরুণ বিপ্লবী — যিনি ভারতীয় দেশপ্রেমিক ইংরেজি কবিতার পথপ্রদর্শক

হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডেরোজিও ছিলেন আধুনিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রথম ও সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত এই তরুণ কবি, শিক্ষক ও চিন্তাবিদ মাত্র ২২ বছর বয়সে মারা যান, কিন্তু স্বল্প জীবনে তিনি যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও ভারতীয় চিন্তা ও সাহিত্যে জ্বলছে। তিনি ছিলেন “ইয়ং বেঙ্গল” আন্দোলনের প্রেরণাস্রষ্টা এবং ভারতীয় দেশপ্রেমিক ইংরেজি কবিতার সত্যিকারের পথিকৃৎ। তাঁর কবিতায় ভারতের গৌরব, ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মুক্তচিন্তা ও সামাজিক সংস্কারের আহ্বান ফুটে উঠেছে।

ডেরোজিও ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব যিনি একদিকে ইউরোপীয় শিক্ষা ও চিন্তাধারায় দীক্ষিত ছিলেন, অন্যদিকে ভারতকে আপন মাতৃভূমি হিসেবে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তাঁর কবিতা শুধু সাহিত্য নয় — এটি ছিল একটি বিপ্লবী ঘোষণা।

শৈশব ও পরিবার

১৮ এপ্রিল ১৮০৯ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন হেনরি লুইস ভিভিয়ান ডেরোজিও। তাঁর বাবা ফ্রান্সিস ডেরোজিও ছিলেন একজন ইন্দো-পর্তুগিজ বণিক এবং মা সোফিয়া জনসন ছিলেন ইংরেজ। পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত। শৈশবে তিনি কলকাতার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করেন, বিশেষ করে ড্রামন্ডের স্কুলে (Derozio’s Academy নামেও পরিচিত)।

ছোটবেলা থেকেই তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও কাব্যপ্রতিভার পরিচয় দেন। তিনি ইংরেজি, ফরাসি, লাতিন ও গ্রিক ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক দায়িত্বও তাঁর কাঁধে এসে পড়ে।

শিক্ষা ও প্রাথমিক প্রভাব

ডেরোজিও ইউরোপীয় আলোকায়ন (Enlightenment) চিন্তাধারায় গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তিনি ভলতেয়ার, রুশো, টমাস পেইন প্রমুখের লেখা পড়তেন। ফলে তাঁর মধ্যে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও সামাজিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতিভেদ প্রথা ও কুসংস্কারের তীব্র বিরোধী ছিলেন।

হিন্দু কলেজ ও ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন

১৮২৬ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক নিযুক্ত হন। সেখানে তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাস পড়াতেন। তাঁর পাঠদান পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন — তিনি ছাত্রদের প্রশ্ন করতে, যুক্তি করতে ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে উৎসাহ দিতেন।

তাঁর ছাত্রদের মধ্যে গড়ে ওঠে “ইয়ং বেঙ্গল” নামক একটি বিপ্লবী দল। এই দলের সদস্যরা (যেমন রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী, প্যারীচাঁদ মিত্র) পরবর্তীকালে বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ডেরোজিও তাঁদের শিখিয়েছিলেন — “প্রশ্ন করো, সন্দেহ করো, যুক্তি দাও।” এটি ছিল তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের জন্য এক বিপ্লবী শিক্ষা।

কাব্য সাধনা ও দেশপ্রেমিক কবিতা

ডেরোজিও ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন। তাঁর কবিতায় ভারতের প্রতি গভীর ভালোবাসা, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা:

  • The Harp of India — ভারতের হারানো গৌরব ও পুনর্জাগরণের আহ্বান।
  • To India – My Native Land — দেশপ্রেমের শক্তিশালী ঘোষণা।
  • Freedom to the Slave — দাসপ্রথা ও মানবাধিকারের প্রতিবাদ।
  • The Fakeer of Jungheera — একটি দীর্ঘ আখ্যানকাব্য, যেখানে প্রেম, বিদ্রোহ ও সামাজিক সংস্কারের কথা আছে।

তাঁর কবিতা ছিল রোমান্টিক ও বিপ্লবী। তিনি প্রথমবারের মতো ইংরেজি ভাষায় ভারতকে “মাতৃভূমি” হিসেবে সম্বোধন করেন এবং দেশপ্রেমকে কাব্যিক রূপ দেন।

বিতর্ক, পদত্যাগ ও শেষ দিন

ডেরোজিওর মুক্তচিন্তা ও বিপ্লবী শিক্ষা রক্ষণশীল সমাজ ও কলেজ কর্তৃপক্ষের চোখে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে। ১৮৩১ সালে তাঁকে হিন্দু কলেজ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। তবু তিনি লেখালেখি ও সামাজিক আলোচনা চালিয়ে যান। তিনি একটি সংবাদপত্রও সম্পাদনা করতেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

১৮৩১ সালের ২৩ ডিসেম্বর মাত্র ২২ বছর বয়সে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর অকালমৃত্যু বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।

ডেরোজিওর উত্তরাধিকার অপরিসীম। তিনি ছিলেন:

  • ভারতীয় ইংরেজি কবিতার (Indian English Poetry) প্রথম সত্যিকারের দেশপ্রেমিক কবি।
  • ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের প্রেরণাস্রষ্টা।
  • মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও সামাজিক সংস্কারের প্রবক্তা।
  • পরবর্তী প্রজন্মের কবি ও চিন্তাবিদদের (যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) জন্য পথপ্রদর্শক।

তাঁর কবিতা আজও পাঠককে মনে করিয়ে দেয় — “জাগো, ওহে ভারত! জাগো আবার!”

Leave a Comment