কবিতার খাতা থেকে – পঞ্চম

হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো (Henry Wadsworth Longfellow, ১৮০৭–১৮৮২)

আমেরিকান ছন্দময় কথক কবি — যিনি ‘ফায়ারসাইড’ কবিতার মাধ্যমে জীবনের গল্প বলেছেন

হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো ছিলেন উনিশ শতকের আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। তিনি “Fireside Poets”-এর অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। তাঁর কবিতা ছন্দময়, গল্পময় এবং সহজবোধ্য — যা পরিবারের সামনে আগুনের পাশে বসে পড়া যায়। তিনি ইউরোপীয় ছন্দ ও রূপকে আমেরিকান থিমের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।

১. জীবনের গীত (A Psalm of Life)

(সবচেয়ে বিখ্যাত উদ্দীপনামূলক কবিতা)

জীবনের গীত বলো না, “এটা শুধু খালি স্বপ্ন!”
আত্মা ঘুমিয়ে থাকলে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু নয়।
জীবন আসল, জীবন গুরুত্বপূর্ণ,
এবং কবর নয় তার শেষ গন্তব্য।

আমাদের হৃদয়, যদিও শক্তিশালী ও সাহসী,
এখনও ড্রামের মতো শব্দ করে মিছিলের সঙ্গে।
আমাদের ভাগ্য নয়, কিন্তু কাজ —
আমাদের লক্ষ্য নয়, কিন্তু শেষ —
আমাদের পথ নয়, কিন্তু লড়াই —
আমাদের পুরস্কার নয়, কিন্তু শ্রম।

জীবনে শিখো, শিখো প্রতিদিন,
প্রতিটি ঘণ্টা, প্রতিটি মিনিট।
যদি তুমি বাঁচতে চাও, তবে কাজ করো,
আর যদি তুমি মরতে চাও, তবে শুয়ে থাকো।

২. গ্রামের কামার (The Village Blacksmith)

গ্রামের কামারের দোকানের নিচে
বড় চেস্টনাট গাছটি ছড়িয়ে আছে তার ডাল।
প্রতিদিন সকালে তিনি শোনেন
গির্জার ঘণ্টার মধুর আওয়াজ।

তিনি শক্তিশালী, তার বুক চওড়া,
তার হাত শক্ত লোহার মতো।
তিনি হাসেন, তিনি গান গান,
আর তার হাতুড়ির শব্দে গ্রাম জেগে ওঠে।

তিনি তার সন্তানদের শেখান
কাজ করতে, সততা রাখতে।
তিনি জানেন — জীবন কঠিন,
কিন্তু পরিশ্রমেই সুখ আসে।

৩. এক্সেলসিয়র (Excelsior)

(উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীকী কবিতা)

এক যুবক হাঁটছিল পাহাড়ের পথে,
হাতে একটি পতাকা — “Excelsior” লেখা।
তুষার পড়ছিল, ঝড় বইছিল,
কিন্তু সে চলছিল — সামনে, সামনে।

“যাও না!” বলল এক বৃদ্ধ,
“এই পথে মৃত্যু আছে।”
কিন্তু যুবক বলল, “আমি যাবো —
Excelsior! উঁচুতে, উঁচুতে!”

সে চলল, যতক্ষণ না
তার শরীর ঠান্ডায় জমে গেল।
কিন্তু তার আত্মা উড়ে গেল —
উঁচুতে, চিরকালের জন্য।

৪. তীর ও গান (The Arrow and the Song)

আমি একটি তীর ছুড়েছিলাম আকাশে,
সেটি উড়ে গেল — কোথায় গেল, কেউ জানে না।
আমি একটি গান গেয়েছিলাম,
সেটি উড়ে গেল — কোথায় গেল, কেউ জানে না।

বছর পরে, একটি ওক গাছের গুঁড়িতে
আমি সেই তীরটি পেলাম — অক্ষত।
আর এক বন্ধুর হৃদয়ে
আমি সেই গানটি পেলাম — অক্ষত।

৫. শিশুদের ঘণ্টা (The Children’s Hour)

শিশুদের ঘণ্টা বাজে সন্ধ্যায়,
যখন আলো নিভে আসে।
তারা আসে আমার কাছে —
হাসতে, খেলতে, গল্প করতে।

তারা আমার হাঁটুর কাছে বসে,
আমার গল্প শোনে।
তারা আমার চুলে হাত বুলায়,
আর বলে — “আবার বলো, দাদু!”

এই মুহূর্তগুলোই জীবনের সবচেয়ে মধুর,
যখন শিশুরা আমার চারপাশে থাকে।
তাদের হাসি, তাদের ভালোবাসা —
এটাই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

৬. পল রেভিয়ারের ঘোড়ায় চড়া (Paul Revere’s Ride) — অংশ

(ঐতিহাসিক বর্ণনামূলক কবিতা)

আঠারো শতকের সত্তর সালের এপ্রিলের এক রাতে,
পল রেভিয়ার ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে পড়লেন।
তিনি চিৎকার করে বললেন, “ব্রিটিশ আসছে!”
আর গ্রামের মানুষ জেগে উঠল।

তাঁর ঘোড়ার খুরের শব্দে
রাতের নীরবতা ভেঙে গেল।
তিনি ছুটলেন — এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে,
স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে।

৭. জোয়ার ওঠে, জোয়ার পড়ে (The Tide Rises, the Tide Falls)

জোয়ার ওঠে, জোয়ার পড়ে,
আর চিরকাল এভাবেই চলবে।
সূর্য অস্ত যায়, রাত নামে,
আর সকাল আবার আসে।

মানুষ আসে, মানুষ যায়,
কিন্তু সমুদ্র চিরকাল থাকে।
তার ঢেউয়ের শব্দে
জীবনের গল্প লেখা হয়।

৮. হারানো যৌবন (My Lost Youth) — অংশ

প্রায়শই আমি মনে করি
সেই শহরের কথা, যেখানে আমি জন্মেছিলাম।
সেই সমুদ্রের তীর, সেই পাহাড়,
সেই শৈশবের দিনগুলো।

যৌবন চলে গেছে, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায়।
আর আমি জানি — জীবন একটি গান,
যা শেষ হয় না, শুধু পরিবর্তিত হয়।

৯. দেবদূতের পদধ্বনি (Footsteps of Angels)

যখন রাত নামে আর আলো নিভে যায়,
আমি শুনি দেবদূতদের পদধ্বনি।
তারা আসে আমার কাছে —
যারা চলে গেছে, কিন্তু ভুলিনি।

তারা আমার পাশে বসে,
আমার হৃদয়ে শান্তি দেয়।
আর আমি জানি — মৃত্যু শেষ নয়,
এটি শুধু একটি দরজা।

১০. দিন শেষ হয় (The Day is Done)

দিন শেষ হয়, সন্ধ্যা নামে,
আর আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি।
আমি চাই একটি শান্ত গান,
যা আমার হৃদয়কে শান্ত করবে।

একজন কবি গান গান,
যার কণ্ঠস্বর মধুর।
আর আমি শুনি — আর ভুলে যাই
দিনের ক্লান্তি, জীবনের যন্ত্রণা।

হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো (Henry Wadsworth Longfellow, ১৮০৭–১৮৮২)

আমেরিকান ছন্দময় কথক কবি — ‘ফায়ারসাইড’ ন্যারেটিভ কবিতার অসাধারণ শিল্পী

হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো ছিলেন উনিশ শতকের আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রিয় কবি। তিনি “Fireside Poets” নামক দলের অন্যতম প্রধান সদস্য। তাঁর কবিতা ছন্দময়, গল্পময় এবং সহজবোধ্য — যা পরিবারের সদস্যরা আগুনের পাশে (fireside) বসে একসঙ্গে পড়তে পারতেন। তিনি ইউরোপীয় ছন্দ ও রূপকে আমেরিকান থিম, ইতিহাস ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন।

লংফেলো শুধু কবি ছিলেন না — তিনি ছিলেন শিক্ষক, অনুবাদক (দান্তের ডিভাইন কমেডি প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অনুবাদ) এবং সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধক। তাঁর বিখ্যাত রচনা The Song of Hiawatha, Evangeline, Paul Revere’s Ride আজও আমেরিকান সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

শৈশব ও প্রারম্ভিক শিক্ষা

২৭ ফেব্রুয়ারি ১৮০৭ সালে মেইনের পোর্টল্যান্ডে (তখন ম্যাসাচুসেটসের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো। তিনি ছিলেন পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। বাবা স্টিফেন লংফেলো ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। মা জিডিয়া ওয়াডসওয়ার্থ ছিলেন বুদ্ধিমতী ও সাহিত্যপ্রেমী।

ছোটবেলা থেকেই তিনি বইয়ের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি ওয়াশিংটন ইরভিং ও স্যার ওয়াল্টার স্কটের লেখা পড়ে বড় হয়েছেন। ১৮২২ সালে বাউডইন কলেজে ভর্তি হন (সহপাঠী ছিলেন ন্যাথানিয়েল হথর্ন)। ১৮২৫ সালে স্নাতক হন।

ইউরোপ ভ্রমণ ও ভাষা শিক্ষা

কলেজ শেষ করে তিনি ইউরোপ ভ্রমণে যান (১৮২৬–১৮২৯)। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও জার্মানিতে থেকে তিনি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি শেখেন। এই সময় তিনি রোমান্টিক সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন এবং পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ছন্দকে আমেরিকান কবিতায় নিয়ে আসেন।

শিক্ষকতা ও সাহিত্যজীবনের শুরু

১৮২৯ সালে বাউডইন কলেজে আধুনিক ভাষার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ১৮৩৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পদে যোগ দেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ও জনপ্রিয় শিক্ষক।

১৮৩৯ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ Voices of the Night প্রকাশিত হয়, যেখানে ছিল বিখ্যাত “A Psalm of Life”। এরপর Ballads and Other Poems (১৮৪২), Poems on Slavery (১৮৪২) ইত্যাদি। ১৮৪৭ সালে Evangeline প্রকাশের পর তিনি জাতীয় খ্যাতি অর্জন করেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও বড় ক্ষতি

১৮৩১ সালে মেরি স্টোরার পটারকে বিয়ে করেন। ১৮৩৫ সালে মেরি ইউরোপে মারা যান — এটি তাঁর প্রথম বড় ক্ষতি। ১৮৪৩ সালে ফ্রান্সেস অ্যাপলটন (ফ্যানি)-কে বিয়ে করেন। তাঁদের ছয়টি সন্তান ছিল।

১৮৬১ সালে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ফ্যানি আগুনে পুড়ে মারা যান। এই ক্ষতি লংফেলোকে গভীরভাবে ভেঙে দেয়। তিনি দাড়ি রাখেন যাতে তার মুখের দাগ ঢাকা থাকে। এই সময় তিনি দান্তের অনুবাদে মনোনিবেশ করেন — যা তাঁকে মানসিক শান্তি দেয়।

প্রধান রচনাসমূহ

  • The Song of Hiawatha (১৮৫৫) — নেটিভ আমেরিকান কিংবদন্তির উপর ভিত্তি করে লেখা মহাকাব্য। ছন্দ (trochaic tetrameter) অসাধারণ।
  • Evangeline (১৮৪৭) — একাডিয়ানদের বিতাড়নের ঐতিহাসিক কাহিনি।
  • Paul Revere’s Ride (১৮৬০) — আমেরিকান স্বাধীনতা যুদ্ধের বর্ণনামূলক কবিতা।
  • The Wreck of the Hesperus — সমুদ্রের ঝড় ও মানুষের অসহায়ত্বের গল্প।
  • The Village Blacksmith, The Children’s Hour, Excelsior — ছন্দময়, নৈতিক শিক্ষামূলক কবিতা।

তাঁর কবিতা “fireside” শৈলীর — সহজ ছন্দ, গল্পের মতো বর্ণনা, যা সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে ও মনে রাখতে পারত।

শৈলী ও জনপ্রিয়তা

লংফেলোর কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ছন্দময় বর্ণনা। তিনি ইউরোপীয় ছন্দ (hexameter, ballad meter) ব্যবহার করে আমেরিকান গল্প বলেছেন। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয় যেন কেউ আগুনের পাশে গল্প শোনাচ্ছে। তিনি জটিল দর্শনের চেয়ে সহজ ভাষায় জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন।

তাঁর সময়ে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বেশি পঠিত ও অনুবাদিত আমেরিকান কবি। তাঁর কবিতা স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ছিল, পরিবারে পড়া হতো।

শেষ জীবন ও মৃত্যু

শেষ বছরগুলোতে তিনি কেমব্রিজের ক্রেগি হাউসে থাকতেন। ১৮৮২ সালের ২৪ মার্চ তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র আমেরিকা শোকাহত হয়। তাঁকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাহিত করা হয় — প্রথম আমেরিকান কবি হিসেবে এই সম্মান পান।

উত্তরাধিকার

লংফেলো আমেরিকান কবিতাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি দেখিয়েছেন — কবিতা শুধু পণ্ডিতদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও। তাঁর “fireside narrative poems” আজও পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে জীবন একটি গল্প — যা ছন্দে, আবেগে ও শিক্ষায় ভরা।

তিনি ছিলেন সেই কবি যিনি বলেছেন:
“জীবন আসল, জীবন গুরুত্বপূর্ণ,
এবং কবর নয় তার শেষ গন্তব্য।”

Leave a Comment