আলফ্রেড, লর্ড টেনিসন (Alfred, Lord Tennyson, ১৮০৯–১৮৯২)
ব্রিটিশ কবি লরিয়েট — যাঁর কবিতায় ছন্দ ও সংগীতের অতুলনীয় যাদু
আলফ্রেড, লর্ড টেনিসন ছিলেন ভিক্টোরিয়ান যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় কবি। তিনি ৪২ বছর (১৮৫০–১৮৯২) ধরে ব্রিটিশ কবি লরিয়েটের পদ অলংকৃত করেছেন — যা ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়কাল। তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অতুলনীয় সংগীতময়তা — ছন্দ, অনুপ্রাস, স্বরসঙ্গতি ও ছন্দের মায়া।
তিনি শোক, প্রকৃতি, বীরত্ব, প্রেম, সন্দেহ ও বিশ্বাসের মতো গভীর বিষয়গুলোকে সুন্দর ছন্দে প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত রচনা: In Memoriam A.H.H. (বন্ধুর শোকে লেখা মহাকাব্যিক শোকগাথা), The Lady of Shalott, Ulysses, The Charge of the Light Brigade ইত্যাদি।
১. ঈগল (The Eagle)
(খুব ছোট কিন্তু শক্তিশালী প্রতীকী কবিতা)
সে একা দাঁড়িয়ে আছে চূড়ায়,
পাহাড়ের কাছাকাছি আকাশে।
সূর্যের নীচে তার ডানা ছড়ানো,
সমুদ্র তার পায়ের তলায় ঘুমায়।
সে হঠাৎ ঝাঁপ দেয় —
বজ্রের মতো, বিদ্যুতের মতো।
আর সমুদ্রের গভীরে মিলিয়ে যায়
তার ছায়া, তার শক্তি, তার গৌরব।
২. ভাঙো, ভাঙো, ভাঙো (Break, Break, Break)
(শোক ও সময়ের অপূরণীয় ক্ষতি)
ভাঙো, ভাঙো, ভাঙো, ও সমুদ্রের ঢেউ,
ধূসর পাথরের গায়ে!
আমি চাই যে আমার জিভ দিয়ে
যে কথাগুলো বেরিয়ে আসে না।
ও নাবিকের ছেলে, তুমি হাসো আর খেলো
তোমার বোনের সঙ্গে!
আর আমার সেই সুন্দর কণ্ঠস্বর
চিরকালের জন্য চুপ হয়ে গেছে।
ভাঙো, ভাঙো, ভাঙো, ও সমুদ্রের ঢেউ,
যতক্ষণ না তোমার শক্তি শেষ হয়!
আর আমার হৃদয় ভাঙবে,
যতক্ষণ না আমার জীবন শেষ হয়।
৩. নদীর পারে (Crossing the Bar)
(মৃত্যু ও পরপারের শান্তিপূর্ণ দর্শন — তাঁর শেষ কবিতাগুলোর একটি)
সূর্য অস্ত যাচ্ছে, তারা জ্বলছে,
আর আমি শুনি নদীর ডাক।
আমি যাবো সেই পারে,
যেখানে জোয়ার ওঠে আর পড়ে।
যদি কোনো ঝড় আসে, তবে সে আসুক,
আমি ভয় পাই না।
কারণ আমি জানি — ওপারে
আমার পাইলট অপেক্ষা করছে।
৪. আলোকিত বাহিনীর অভিযান (The Charge of the Light Brigade)
(ক্রিমিয়ান যুদ্ধের বীরত্ব ও ভুলের মহাকাব্য)
আধ মাইল, আধ মাইল,
আধ মাইল এগিয়ে!
সবাই উপত্যকায় ঢুকল —
মৃত্যুর ছায়ায়।
“আগে বাড়ো, আলোকিত বাহিনী!”
তারা জানত না ভুল হয়েছে,
তারা জানত না মৃত্যু অপেক্ষা করছে —
তবু তারা এগিয়ে গেল।
কামানের গোলা ডানে, বাঁয়ে, সামনে —
তবু তারা ঘোড়া ছুটিয়ে গেল।
তারা লড়াই করল, তারা মরল,
আর ইতিহাস তাদের নাম লিখে রাখল।
৫. শালটের রানি (The Lady of Shalott) — অংশ
(রহস্যময়, স্বপ্নময় কবিতা)
শালটের দ্বীপে একটি টাওয়ার আছে,
যেখানে শালটের রানি বাস করে।
সে কখনো জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় না,
শুধু আয়নায় দেখে জগতের ছায়া।
সে বুনছে একটি জাদুর কাপড়,
যেখানে সে দেখে সবকিছুর প্রতিফলন।
কিন্তু যেদিন সে সরাসরি দেখল ল্যান্সেলটকে,
সেদিন তার জাদু ভেঙে গেল।
সে নৌকায় চড়ে নদীতে ভাসিয়ে দিল নিজেকে,
আর গাইল শেষ গান —
“আমি শালটের রানি।”
৬. ইউলিসিস (Ulysses) — অংশ
(বীরত্ব, অভিযান ও বার্ধক্যের দর্শন)
আমি রাজা ইউলিসিস।
আমি বৃদ্ধ, কিন্তু আমার আত্মা
এখনও তরুণ — যেমন ছিল
যখন আমি ট্রয়ের যুদ্ধে লড়েছিলাম।
আমি চাই আবার যাত্রা করতে।
আমি চাই আবার দেখতে নতুন দিগন্ত,
নতুন সমুদ্র, নতুন তারা।
কারণ জীবন শুধু বসে থাকা নয় —
জীবন হলো লড়াই, জয় আর অভিযান।
৭. কাঁদো, নিষ্ফল কান্না (Tears, Idle Tears)
(শোক ও স্মৃতির মধুর বেদনা)
কাঁদো, নিষ্ফল কান্না, আমার চোখে!
আমি জানি না কেন আমি কাঁদছি।
এই কান্না আসে সেই দিনগুলো থেকে
যা চলে গেছে, কিন্তু ভোলা যায় না।
সেই গ্রীষ্মের দিনগুলো, সেই ফুলের গন্ধ,
সেই হাসি, সেই ভালোবাসা —
সবকিছু এখন শুধু স্মৃতি।
আর আমি কাঁদি — কারণ সেগুলো আর ফিরবে না।
৮. মারিয়ানা (Mariana)
(একাকীত্ব ও অপেক্ষার বেদনাময় চিত্র)
মারিয়ানা বাস করে একটি নির্জন বাড়িতে,
যেখানে শুধু বাতাস আর পাতার শব্দ।
সে অপেক্ষা করে — দিনের পর দিন,
রাতের পর রাত।
“আমি ক্লান্ত, আমি ক্লান্ত,” সে বলে,
“আর আমি চাই মৃত্যু আসুক।”
কিন্তু মৃত্যুও আসে না।
শুধু অপেক্ষা চলতে থাকে — চিরকাল।
৯. মিষ্টি আর নরম (Sweet and Low)
(মায়ের লোরি — সুন্দর সংগীতময়)
মিষ্টি আর নরম, বাতাস বইছে সমুদ্রের ওপর,
আর আমার শিশু ঘুমিয়ে পড়ছে।
ঘুমিয়ে পড়ো, আমার প্রিয়,
আমি তোমার পাশে আছি।
তোমার বাবা সমুদ্রে আছে,
কিন্তু সে ফিরে আসবে।
ততক্ষণ ঘুমিয়ে পড়ো,
আমার মিষ্টি শিশু।
১০. টিথোনাস (Tithonus) — অংশ
(অমরত্বের অভিশাপ ও বার্ধক্য)
আমি টিথোনাস।
আমি অমর, কিন্তু বৃদ্ধ।
আমার শরীর শুকিয়ে গেছে,
আমার চুল সাদা হয়ে গেছে।
আমি চাই মৃত্যু আসুক,
কিন্তু মৃত্যু আসে না।
আমি চাই আবার যুবক হতে,
কিন্তু সময় ফিরে আসে না।
হে দেবী, তুমি আমাকে অমরত্ব দিয়েছিলে,
কিন্তু ভুলে গিয়েছিলে যৌবন দিতে।
আর এখন আমি শুধু অপেক্ষা করি —
মৃত্যুর জন্য, যা কখনো আসবে না।
আলফ্রেড, লর্ড টেনিসন (Alfred, Lord Tennyson, ১৮০৯–১৮৯২)
ব্রিটিশ কবি লরিয়েট — যাঁর কবিতায় ছন্দ ও সংগীতের অতুলনীয় যাদু
আলফ্রেড, লর্ড টেনিসন ছিলেন ভিক্টোরিয়ান যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী, জনপ্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী কবি। তিনি ৪২ বছর (১৮৫০–১৮৯২) ধরে ব্রিটিশ কবি লরিয়েটের পদ অলংকৃত করেছেন — যা ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়কাল। তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অতুলনীয় সংগীতময়তা — ছন্দ, অনুপ্রাস, স্বরসঙ্গতি ও লাইনের মায়া। তিনি শোক, প্রকৃতি, বীরত্ব, প্রেম, সন্দেহ ও বিশ্বাসের মতো গভীর বিষয়গুলোকে এমন ছন্দে বেঁধেছেন যে কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয় যেন কেউ গান গাইছে।
তাঁর বিখ্যাত রচনা In Memoriam A.H.H., The Lady of Shalott, Ulysses, The Charge of the Light Brigade, Idylls of the King আজও বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তিনি ছিলেন সেই কবি যিনি ভিক্টোরিয়ান যুগের আত্মাকে কাব্যিক রূপ দিয়েছেন।
শৈশব ও পরিবার
৬ আগস্ট ১৮০৯ সালে ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ারের সোমার্সবিতে জন্মগ্রহণ করেন আলফ্রেড টেনিসন। তিনি ছিলেন পরিবারের চতুর্থ সন্তান — মোট বারো ভাইবোনের মধ্যে একজন। বাবা জর্জ ক্লেটন টেনিসন ছিলেন গ্রামের রেক্টর, কিন্তু মানসিক অসুস্থতায় ভুগতেন। মা এলিজাবেথ ফাইচ ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও স্নেহময়ী।
শৈশবে তিনি প্রকৃতির মাঝে বড় হন — গ্রামের মাঠ, নদী ও বন তাঁর কবিতার প্রথম অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। তিনি খুব অল্প বয়সেই কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৮২৭ সালে ভাই চার্লসের সঙ্গে Poems by Two Brothers প্রকাশ করেন।
কেমব্রিজ ও আর্থার হ্যালাম
১৮২৭ সালে ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি আর্থার হেনরি হ্যালামের সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন — যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে ওঠে। হ্যালাম ছিলেন উজ্জ্বল, বুদ্ধিমান ও আদর্শবাদী। তাঁদের বন্ধুত্ব টেনিসনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
১৮৩৩ সালে হ্যালাম অপ্রত্যাশিতভাবে মারা যান (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ)। এই ক্ষতি টেনিসনকে গভীর শোকে ডুবিয়ে দেয়। এই শোক থেকেই জন্ম নেয় তাঁর মহাকাব্যিক শোকগাথা In Memoriam A.H.H. — যা পরবর্তীকালে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা হয়ে ওঠে।
প্রাথমিক সাহিত্যজীবন ও সংকট
১৮৩০ সালে Poems, Chiefly Lyrical প্রকাশিত হয়। ১৮৩২ সালে আরেকটি সংকলন বের হয়। কিন্তু সমালোচকরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেন। কিছু সমালোচক তাঁকে “অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ” বলে সমালোচনা করেন। এতে টেনিসন গভীর হতাশায় পড়েন এবং প্রায় দশ বছর কোনো বড় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন না।
এই সময় তিনি পরিবারের আর্থিক সমস্যা ও নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তবু তিনি লেখালেখি চালিয়ে যান।
কবি লরিয়েট নির্বাচন ও সাফল্য
১৮৫০ সালে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের মৃত্যুর পর টেনিসনকে কবি লরিয়েট নির্বাচিত করা হয়। একই বছর In Memoriam A.H.H. প্রকাশিত হয় — যা তাঁকে জাতীয় খ্যাতি এনে দেয়। রানি ভিক্টোরিয়া তাঁর বড় ভক্ত ছিলেন।
১৮৫৫ সালে Maud প্রকাশিত হয়। ১৮৫৯ সালে Idylls of the King-এর প্রথম অংশ বের হয় — যা রাজা আর্থার ও গোলটেবিলের নাইটদের কাহিনি নিয়ে লেখা মহাকাব্য। এটি তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী রচনা।
প্রধান রচনাসমূহ
- In Memoriam A.H.H. (১৮৫০) — বন্ধু আর্থার হ্যালামের শোকে লেখা ১৩৩টি কবিতার চক্র। এতে বিশ্বাস, সন্দেহ, বিবর্তনবাদ ও পরকাল নিয়ে গভীর চিন্তা আছে।
- Idylls of the King (১৮৫৯–১৮৮৫) — রাজা আর্থারের কিংবদন্তি নিয়ে দশটি আখ্যানকাব্য।
- Maud (১৮৫৫) — একটি নাট্যকাব্য (dramatic monologue)।
- The Charge of the Light Brigade (১৮৫৪) — ক্রিমিয়ান যুদ্ধের বীরত্ব ও ভুলের শক্তিশালী বর্ণনা।
- The Lady of Shalott, Ulysses, Crossing the Bar, Tithonus — ছোট কিন্তু অমর কবিতা।
ব্যক্তিগত জীবন ও ক্ষতি
১৮৫০ সালে এমিলি সেলউডকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই ছেলে — হ্যালাম ও লিওনেল। ১৮৭৪ সালে ফ্যানি (এক আত্মীয়) আগুনে পুড়ে মারা যান — যা টেনিসনকে গভীরভাবে আঘাত করে। তিনি প্রায়ই বিষণ্ণতায় ভুগতেন এবং মদ্যপানের প্রবণতা ছিল।
তিনি আইল অব উইটের ফ্যারিংফোর্ড এবং সারের অল্ডওয়ার্থে বাস করতেন। প্রকৃতির মাঝে থেকে তিনি অনুপ্রেরণা পেতেন।
শৈলী: সংগীতময়তা ও ছন্দ
টেনিসনের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংগীতময়তা। তিনি ছন্দ, অনুপ্রাস, পুনরাবৃত্তি ও স্বরের খেলা ব্যবহার করে এমন লাইন তৈরি করতেন যা মনে থেকে যায়।
উদাহরণ:
“Break, break, break,
On thy cold gray stones, O Sea!”
তাঁর বর্ণনামূলক কবিতা (narrative poems) পড়তে পড়তে মনে হয় যেন কেউ গল্প শোনাচ্ছে। তিনি blank verse, rhyming couplets ও ballad meter-এ দক্ষ ছিলেন।
শেষ জীবন ও মৃত্যু
শেষ বছরগুলোতে তিনি অল্ডওয়ার্থে থাকতেন। ১৮৯২ সালের ৬ অক্টোবর তিনি মারা যান। তাঁকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাহিত করা হয় — চসার ও ব্রাউনিংয়ের পাশে।
উত্তরাধিকার
টেনিসন ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। তাঁর কবিতা স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ছিল, পরিবারে পড়া হতো। তিনি ভিক্টোরিয়ান যুগের আত্মাকে কাব্যিক রূপ দিয়েছেন — শোক, বিশ্বাসের সংকট, বীরত্ব ও নৈতিকতা।
তাঁর প্রভাব পরবর্তী কবিদের (যেমন ইয়েটস, এলিয়ট) ওপর পড়েছে। আজও “The Lady of Shalott”, “Ulysses”, “In Memoriam” ও “Crossing the Bar” বিশ্বজুড়ে পঠিত হয়।
তিনি ছিলেন সেই কবি যিনি বলেছেন:
“’Tis better to have loved and lost
Than never to have loved at all.”